অপারেশন সিন্দুর এর পর এক বছরে প্রায় ১২ শতাংশ মূল্য হারাল ভারতীয় টাকা, মোদী সরকারের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২০ মেঃ ভারতীয় অর্থনীতিকে ঘিরে ফের উঠতে শুরু করেছে বড়সড় প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাপট, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি কিংবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার অজুহাত বহুদিন ধরেই সামনে এনে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু এবার যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা শুধু অর্থনীতিবিদদের নয়, রাজনৈতিক মহলেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
কারণ, পাকিস্তানি টাকার তুলনাতেও দ্রুত মূল্য হারাচ্ছে ভারতীয় রুপি। দ্য ওয়ায়ারের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত এক বছরে পাকিস্তানি টাকার বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রার মূল্য প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি আর্থিক সূচকের পরিবর্তন নয়, বরং ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামোয় গভীর দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালের মে মাসে সংঘটিত টানা ৮৮ ঘণ্টার সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সিন্দুর’এর পর থেকেই ভারতীয় মুদ্রার এই পতনের ধারা প্রকট হতে শুরু করে। সেই সময় মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। আর ঠিক সেই সময় থেকেই রুপির অবনমন স্পষ্ট হতে থাকে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের ১৫ মে প্রতি ভারতীয় রুপির বিপরীতে পাকিস্তানি টাকার বিনিময় মূল্য ছিল ৩.২৯১৩। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে, ২০২৬ সালের ১৮ মে সেই হার কমে দাঁড়ায় ২.৯০১০ পাকিস্তানি টাকা। অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রা এই সময়ে প্রায় ১১.৮৬ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, শুধুমাত্র ২০২৬ সালেই রুপির পতনের হার প্রায় ৬.৮ শতাংশ। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি দেশের মুদ্রা যখন ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হতে থাকে, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে।
বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা, ব্যবসা, পর্যটন থেকে শুরু করে আমদানি নির্ভর পণ্যের বাজার সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়ে যায়। ইতিমধ্যেই দেশের বহু মধ্যবিত্ত পরিবার বিদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। আমদানি নির্ভর শিল্পগুলিতেও বাড়ছে চাপ। শুধু পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশি মুদ্রার বিপরীতেও ভারতীয় টাকার দুর্বলতা এখন স্পষ্ট। গত এক বছরে প্রতি ভারতীয় টকায় বাংলাদেশি টাকার মান ১.৪২ থেকে কমে ১.২৮ এ নেমে এসেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকার তুলনায় ভারতীয় মুদ্রার মূল্যও প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের বক্তব্য, যদি এই অবমূল্যায়নের কারণ শুধুমাত্র ডলারের শক্তি বৃদ্ধি বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ হতো, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর মুদ্রাও একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় রুপির পতন তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রকট। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সমস্যা কি তাহলে ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতিতেই?
বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে এই তুলনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, পাকিস্তান গত বছর নতুন করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের আর্থিক সহায়তা নিয়েছে এবং কঠোর আর্থিক সংস্কার কার্যকর করতে বাধ্য হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতেও পাকিস্তানি টাকার তুলনায় ভারতীয় রুপির এই দুর্বলতা অর্থনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অতীত বক্তব্যকেও নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। ২০১২ ও ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী থাকাকালীন মোদী বারবার অভিযোগ করেছিলেন যে টাকার অবমূল্যায়ন আসলে ইউপিএ সরকারের ব্যর্থতা ও দুর্বল প্রশাসনের প্রতিচ্ছবি। সেই সময় তাঁর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক।
তিনি দাবি করেছিলেন, শক্তিশালী সরকার থাকলে দেশের মুদ্রা কখনও এতটা দুর্বল হতে পারে না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বক্তব্যই এখন উল্টোভাবে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে বিরোধীরা। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, গত এক দশকে দেশের অর্থনীতি কাগজে-কলমে শক্তিশালী দেখানোর চেষ্টা হলেও বাস্তবে বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, রপ্তানি হ্রাস এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলি ক্রমশ প্রকট হয়েছে।
অর্থনৈতিক মহলের দাবি, শুধুমাত্র বিদেশি বিনিয়োগের প্রচার বা অবকাঠামো নির্মাণের বড় বড় প্রকল্প দেখিয়ে অর্থনীতির ভিত মজবুত করা যায় না। উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, শিল্পোন্নয়ন এবং রপ্তানির স্থায়ী উন্নতি ছাড়া মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন। এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমসও সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, মোদী সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে ভারতীয় টাকার ধারাবাহিক পতন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েকটি ত্রৈমাসিকে বিশ্বের প্রধান মুদ্রাগুলির মধ্যে ভারতীয় রুপিই সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স করেছে। এরই মধ্যে বিদেশ ভ্রমণের উপর অতিরিক্ত কর আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ হতেই সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এতটাই বাড়ে যে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিজেই সামাজিক মাধ্যমে এসে সেই খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করতে হয়।
বিশ্ব অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরাও আশাবাদী নন। জাপানের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান এমইউএফজি মার্চ মাসে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি যেদিকেই মোড় নিক না কেন, চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত ভারতীয় টাকার ওপর চাপ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সাময়িকভাবে পতনের গতি কমাতে পারে, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান না হলে রুপির স্থায়ী পুনরুদ্ধার সম্ভব নয় বলেই মত তাদের।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা পুনর্গঠন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য—এই তিন ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে। আর সেই চাপের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দেশের মুদ্রাবাজারে। ফলে প্রশ্ন এখন একটাই, ভারতীয় অর্থনীতি কি সত্যিই বিশ্বের দ্রুততম বিকাশশীল অর্থনীতির পথে এগোচ্ছে, নাকি শক্তিশালী প্রচারের আড়ালে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে দেশের আর্থিক ভিত?








