চার দিনের মাথায় দ্বিতীয়বার বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম, ভোটের পরেই মূল্যবৃদ্ধি ঘিরে ক্ষোভ দেশজুড়ে
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২০ মেঃ দেশজুড়ে লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির মাঝেই ফের সাধারণ মানুষের মাথায় নতুন বোঝা চাপাল জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। মঙ্গলবার এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। সরকারি তেল সংস্থাগুলি প্রতি লিটার পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর ৯০ পয়সা করে মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা করতেই দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে পরিবহণ ব্যবসায়ী সব মহলেই এখন একটাই প্রশ্ন, আর কত চাপ বইবে সাধারণ মানুষ?
প্রায় চার বছর ধরে জ্বালানির দাম স্থির রাখার পর হঠাৎ ধারাবাহিক এই মূল্যবৃদ্ধিকে ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন শেষ হতেই সরকার আর মানুষের কথা ভাবছে না। ভোটের আগে দাম চেপে রেখে এখন একের পর এক ধাক্কা দেওয়া হচ্ছে জনগণকে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নয়াদিল্লিতে পেট্রোলের দাম বেড়ে হয়েছে ৯৮.৬৪ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৯১.৫৮ টাকা। তবে দেশের বিভিন্ন শহরে এই দাম আরও অনেক বেশি। অসমের রাজধানী গুয়াহাটিতে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ১০২.২৯ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৯৩.৬১ টাকায় পৌঁছেছে। মুম্বইয়ে পেট্রোলের দাম ১০৭ টাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। কলকাতাতেও পেট্রোলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৯.৭০ টাকা।
অনেকের মতে, দেশের বহু জায়গায় জ্বালানির দাম কার্যত আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে। শুধু গাড়ির মালিক নন, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে নিত্যদিনের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। কারণ পরিবহণ খরচ বাড়লেই বাজারে সবজির দাম থেকে শুরু করে মাছ-মাংস, রান্নার গ্যাস, ওষুধ, নির্মাণসামগ্রী সব কিছুর দামই বাড়তে শুরু করে। ইতিমধ্যেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নিয়ে নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষের। তার ওপর জ্বালানির এই নতুন ধাক্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে বলেই আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের।
শহরের এক গাড়ি চালকক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, প্রতিদিন তেলের দাম বাড়ছে, কিন্তু আমাদের আয় তো বাড়ছে না। যাত্রী ভাড়া বাড়ালে মানুষ ঝগড়া করে, আর না বাড়ালে সংসার চালানো যায় না। মাসের শেষে হাতে কিছুই থাকছে না। বিদ্যুতের বিল, বাজার, স্কুলের খরচ সব বেড়েছে। এখন আবার পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়িয়ে সরকার সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। সচেতন মানুষের, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সরকারের নীতিগত ব্যর্থতাও।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা-ইজরায়েল-ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহণে বিঘ্ন ঘটায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ চাপে পড়েছে। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সময় কি সেই সুবিধা সাধারণ মানুষ পুরোপুরি পেয়েছিল?
অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, কেন্দ্র সরকার দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানির ওপর বিপুল পরিমাণ আবগারি শুল্ক ও কর আরোপ করে আসছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার পূর্ণ সুফল সাধারণ মানুষ পায় না। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই সেই বোঝা পুরোপুরি চাপিয়ে দেওয়া হয় ভোক্তাদের ওপর। পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব সুজাতা শর্মা জানিয়েছেন, গত ১৫ মে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পরও তেল কোম্পানিগুলির লোকসানের মাত্র এক চতুর্থাংশ পূরণ হয়েছে।
তাঁর দাবি, এখনও প্রতিদিন প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা লোকসানের মুখে রয়েছে তেল সংস্থাগুলি। কিন্তু সাধারণ মানুষের বক্তব্য একেবারেই ভিন্ন। তাঁদের প্রশ্ন, যখন তেলের দাম কমে, তখন কি আমাদের খরচ কমে? আর বাড়লেই কেন সব চাপ জনগণের ঘাড়ে? ক্ৰিসিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের যে হারে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তার তুলনায় ভারতে খুচরা বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এখনও কম। তবু বাস্তব বলছে, এই সামান্য বৃদ্ধিই সাধারণ মানুষের সংসারে বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এদিকে পেট্রোল-ডিজেলের পাশাপাশি সিএনজি-র দামও প্রতি কিলোগ্রামে ১ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফলে পরিবহণ খরচ আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিবহণ সংগঠনগুলির একাংশ ইতিমধ্যেই বাস ও ট্রাক ভাড়া বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারদরে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই ইস্যুতে কেন্দ্রকে তীব্র আক্রমণ করেছে। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেখানো হয়েছিল, আর ভোট শেষ হতেই শুরু হয়েছে মূল্যবৃদ্ধির ঝড়।
সামাজিক মাধ্যমেও ক্ষোভ বাড়ছে। বহু মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, দেশ ডিজিটাল হচ্ছে, অর্থনীতি পাঁচ ট্রিলিয়নের স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের পকেট কেন প্রতিদিন খালি হচ্ছে? অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। আর তার সবচেয়ে বড় শিকার হবে সাধারণ মানুষই। এখন দেশের কোটি কোটি মানুষের একটাই আর্তি জ্বালানির আগুনে আর কত পুড়বে সাধারণের সংসার?








