মধ্যাহ্নভোজ, রাঁধুনির অনুপস্থিতি ও স্কুল পরিচালনায় একাধিক অনিয়মের তদন্তের দাবি
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ জুলাইঃ হাইলাকান্দি শিক্ষা খণ্ডের আওতাধীন ৫১৩ নং কবিগুরু এলপি স্কুলকে কেন্দ্র করে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। সরকারের ঘোষিত ‘সম্প্রীতি ভোজন সপ্তাহ’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত এক অভিভাবককে প্রকাশ্যে অপমান ও হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি বদর উদ্দিন লস্করের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি নিয়ে অভিভাবক মহল, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারের নির্দেশনা অনুসারে সম্প্রীতি ভোজন সপ্তাহ উপলক্ষে অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি, সিআরসিসি, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে স্কুলে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির সংখ্যালঘু মোর্চার কালীনগর মণ্ডল সভাপতি বিলাল উদ্দিন চৌধুরী, সিআরসিসি হিফজুর রহমান মজুমদার, বর্ণীব্রিজ জিপির সভানেত্রী পিংকি স্বর্ণালী, উত্তর নারাইনপুর চতুর্থ খণ্ড ৩ নম্বর গ্রুপের সদস্যা মমতা বেগম বড়ভূঁইয়া-সহ আরও অনেকে।
আমন্ত্রিতদের মধ্যেই ছিলেন অভিভাবক ইলাছ উদ্দিন লস্কর। তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে বসে ভোজন করার সময় স্বাভাবিকভাবেই কয়েকজন শিক্ষার্থীকে জানতে চান, প্রতিদিন স্কুলে নিয়মিতভাবে ও মানসম্মত খাবার দেওয়া হয় কি না। অভিযোগ, এই প্রশ্ন করাই যেন তাঁর অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কিছুক্ষণের মধ্যেই স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি বদর উদ্দিন লস্কর সেখানে উপস্থিত হয়ে ইলাছ উদ্দিন লস্করের সঙ্গে অত্যন্ত রূঢ়, অশোভন ও অপমানজনক ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। বহু মানুষের সামনে তাঁকে হেয়প্রতিপন্ন করা হয় বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, অপমানিত অভিভাবক অর্ধেক খাবার খেয়েই অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। তিনি দাবি করেছেন, নিজেকে নিরাপদ মনে না করায় প্রাণভয়ে স্কুল ত্যাগ করেন।

ঘটনার পর এলাকায় প্রশ্ন উঠেছে, একজন অভিভাবক যদি নিজের সন্তানের স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের খাবারের মান সম্পর্কে জানতে চান, তবে সেটি কি অপরাধ? অভিভাবকদের অংশগ্রহণ ও মতামতকে উৎসাহিত করার কথা যেখানে শিক্ষা দপ্তর বারবার বলছে, সেখানে এমন আচরণ কি বিদ্যালয়ের পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? নির্যাতিত অভিভাবক ইলাছ উদ্দিন লস্কর আরও অভিযোগ করেন, স্কুলে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অনিয়ম চলছে। তাঁর দাবি, মধ্যাহ্নভোজের খাবারের গুণগত মান এবং নিয়মিত পরিবেশন নিয়ে বহুদিন ধরেই অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। অনুষ্ঠানের দিন অতিথিদের সামনে ভালো মানের খাবার পরিবেশন করা হলেও, সাধারণ দিনে ছাত্রছাত্রীরা সেই মানের খাবার পায় না বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এছাড়া তিনি আরও দাবি করেন, স্কুলের নিযুক্ত রাঁধুনি হেনা বেগম মজুমদার অধিকাংশ দিনই স্কুলে অনুপস্থিত থাকেন। শুধুমাত্র বিশেষ অনুষ্ঠান বা বড় আয়োজনের দিন তাঁকে দেখা যায়। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, প্রতিদিনের রান্নার দায়িত্ব কে পালন করেন? সরকারি নিয়ম যথাযথভাবে মানা হচ্ছে তো? অভিযোগের তীর গিয়েছে প্রধান শিক্ষিকা কমলা বেগম মজুমদারের দিকেও। অভিযোগকারীর বক্তব্য, সভাপতি ও প্রধান শিক্ষিকার যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে এবং নানা অনিয়ম ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে।
যদিও এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পুরো ঘটনায় বিদ্যালয়ের তদারকি কর্মকর্তা তথা সিআরসিসি হিফজুর রহমান মজুমদারের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর প্রশ্ন, যদি একজন অভিভাবককে তাঁর সামনেই প্রকাশ্যে অপমান করা হয়ে থাকে, তবে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পরিবেশ সম্পর্কে কী ধারণা পাওয়া যায়?
এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি বদর উদ্দিন লস্কর বিজেপির সংখ্যালঘু মোর্চার কালীনগর মণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত। সেই কারণেই কি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এমন আচরণ করা হয়েছে, এমন প্রশ্নও তুলছেন অনেক অভিভাবক। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে সভাপতির কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, বিদ্যালয়ে অভিভাবকদের মর্যাদা এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের মান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একটি বিদ্যালয় শুধুমাত্র পড়াশোনার জায়গা নয়, এটি শিশুদের নৈতিক শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্মানেরও কেন্দ্র।
সেখানে একজন অভিভাবক যদি প্রশ্ন তোলার কারণে প্রকাশ্যে অপমানিত হন, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে সাংবাদিকতার ন্যায়সংগত নীতির স্বার্থে উল্লেখ করা প্রয়োজন, উপরোক্ত সমস্ত অভিযোগ অভিযোগকারী ও স্থানীয়দের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। অভিযোগগুলির বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা, স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বিভাগের বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হবে।
এখন এলাকাবাসী ও অভিভাবকদের একটাই দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। বিদ্যালয়ের মধ্যাহ্নভোজ প্রকল্প, রাঁধুনির উপস্থিতি, স্কুল পরিচালনার স্বচ্ছতা এবং অনুষ্ঠানে অভিভাবককে অপমানের অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করা হোক। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বিদ্যালয়ে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট সভাপতি, প্রধান শিক্ষিকা এবং শিক্ষা বিভাগের বক্তব্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদনটিতে যুক্ত করলে এটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও আইনগতভাবে নিরাপদ হবে।





