শিলচর-গুয়াহাটি রেলে মহিলা যাত্রীকে ‘আলফা সদস্য’আখ্যা দিয়ে হেনস্তা, ফেসবুক লাইভ ঘিরে চাঞ্চল্য
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২০ মেঃ শিলচর থেকে গুয়াহাটি অভিমুখী যাত্রীবাহী ট্রেনে সংঘটিত এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার জেরে সমগ্র বরাক উপত্যকাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ, এক নিরীহ মহিলা যাত্রীকে প্রকাশ্যে ‘আলফা সদস্য’বলে সন্দেহ প্রকাশ করে চলন্ত ট্রেনেই ঘিরে ধরে দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক ও শারীরিক হেনস্তা করা হয়। শুধু তাই নয়, পুরো ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ধারণ করে ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচারও করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
সভ্য সমাজে এ ধরনের ‘মরাল পুলিশিং’, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং এক মহিলাকে প্রকাশ্যে অপমান করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন প্রশ্নের মুখে মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আইনের শাসন। ভুক্তভোগী মহিলার নাম সামসাদ বেগম চৌধুরী। তাঁর পিতা প্রয়াত মোহাম্মদ আলী চৌধুরী একজন পুলিশ কর্মী ছিলেন বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। তাঁর ভাই জামিদুল হক চৌধুরী বর্তমানে বিএসএফ-এ কর্মরত। বাড়ি শিলচর সদর থানা এলাকার বাদ্রিপার পঞ্চম খণ্ড গ্রামে।
দীর্ঘ প্রায় দশ বছর ধরে তিনি ডিমাপুরে টেইলারিংয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। গত শনিবার কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে শিলচর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠেন তিনি। কিন্তু যাত্রাপথেই তাঁর জীবনে নেমে আসে এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রেন শিলচর ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই পাচগ্রাম এলাকার কাছে একই কম্পার্টমেন্টে থাকা মৌমিতা রায় ওরফে মৌ নামের এক মহিলা এবং তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন পুরুষ যাত্রী সামসাদ বেগম চৌধুরীকে লক্ষ্য করে কটূক্তি শুরু করেন। প্রথমে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকানো, পরে নানা প্রশ্ন, এবং ধীরে ধীরে প্রকাশ্য জেরা পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
অভিযোগ, মৌমিতা রায় নিজেকে এক পুলিশ আধিকারিকের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে প্রভাব খাটাতে শুরু করেন এবং সেই পরিচয়ের জোরে অন্যদেরও উসকে দেন। এরপর পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যেখানে অভিযুক্তরা ওই মহিলা যাত্রীকে জোরপূর্বক ‘আলফা সদস্য’বলে সন্দেহ প্রকাশ করে তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র তল্লাশি করতে শুরু করেন। ব্যাগ, কাপড়চোপড়, নথিপত্র সবকিছু প্রকাশ্যে খতিয়ে দেখা হয়।
অথচ তল্লাশিতে কোনও আপত্তিকর বস্তু বা সন্দেহজনক নথি না পাওয়া গেলেও থামেননি অভিযুক্তরা। বরং অভিযোগ, চলন্ত ট্রেনের মধ্যেই প্রায় আধঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাঁকে ঘিরে রেখে অপমান, ভয় দেখানো, চিৎকার-চেঁচামেচি এবং মানসিক চাপে ফেলা হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো, এই পুরো ঘটনাটি অভিযুক্ত মৌমিতা রায় নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভ সম্প্রচার করেন। অর্থাৎ একজন অসহায় মহিলা যাত্রীর আতঙ্ক, কান্না ও অপমানকে সামাজিক মাধ্যমে দর্শনীয় কনটেন্ট এ পরিণত করা হয়। ভিডিওটি মুহূর্তের মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
বহু মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন, কোন অধিকারে একজন সাধারণ নাগরিক অন্য আরেকজন যাত্রীকে সন্ত্রাসবাদী তকমা দিয়ে প্রকাশ্যে অপমান করতে পারেন? যদি সত্যিই কোনও সন্দেহ থেকে থাকে, তাহলে রেল পুলিশ, আরপিএফ বা সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীকে খবর না দিয়ে কেন আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া হলো? সচেতন মহলের বক্তব্য, এই ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত হেনস্তার ঘটনা নয়, বরং এটি সমাজে বাড়তে থাকা ‘মব জাস্টিস’ও ‘মরাল পুলিশিং’এর এক বিপজ্জনক উদাহরণ।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার নেশায় অনেকেই আইনের ঊর্ধ্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। অভিযোগ উঠছে, কিছু মানুষ এখন ক্যামেরা হাতে নিয়ে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন, যেখানে কোনও তদন্ত নেই, কোনও প্রমাণ নেই, অথচ রয়েছে প্রকাশ্য অপমান, হুমকি এবং চরিত্রহনন।
সচেতন মানুষের মতে, কারও বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে তোলা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এ ধরনের অভিযোগ যদি ভিত্তিহীন হয়, তাহলে তা শুধু মানহানিকর নয়, একজন সাধারণ মানুষের জীবন ও সামাজিক মর্যাদাকেও ধ্বংস করে দিতে পারে।
একজন মহিলা যাত্রীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। কারণ চলন্ত ট্রেনে বহু মানুষের সামনে তাঁকে যেভাবে হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ, তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল বলেই মনে করছেন অনেকে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ভুক্তভোগীর আত্মীয় সালাহ উদ্দিন চৌধুরী। তিনি জানান, একজন নিরীহ মহিলাকে পরিকল্পিতভাবে অপমান করা হয়েছে।
কোনও প্রমাণ ছাড়াই তাঁকে আলফা সদস্য বলে প্রচার করা হয়েছে। পুরো ঘটনাটি ফেসবুকে লাইভ করে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা হয়েছে। আমরা এর ন্যায়বিচার চাই। তিনি আরও জানান, অভিযুক্ত মৌমিতা রায় এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে আগামী বুধবার আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হবে।
জেলার বিভিন্ন মহল থেকেও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। অনেকেই বলছেন, যদি এই ধরনের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যে কেউ সন্দেহের বশে অন্য কাউকে দেশদ্রোহী, জঙ্গি বা অপরাধী আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে নিগ্রহ করতে উৎসাহিত হবে। এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং আইনের প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ট্রেনে, বাসে বা জনসমক্ষে একজন মহিলাকে ঘিরে ধরে জেরা করা, ভিডিও করা এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা সম্পূর্ণ অমানবিক ও নিন্দনীয়। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, একজন নারীর সম্মান ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কি কোনও মূল্য নেই? আজ যদি একজন নিরীহ নারী এইভাবে অপমানিত হন, তাহলে আগামী দিনে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপদ থাকবেন? এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আইনের শাসন কি সাধারণ মানুষের হাতে চলে যাচ্ছে?
সামাজিক মাধ্যমের লাইভ ক্যামেরা কি এখন আদালতের বিকল্প? আর কতদিন সন্দেহ এর নামে সাধারণ মানুষকে জনসমক্ষে অপমানিত হতে হবে? শিলচর-গুয়াহাটি রেলের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, সভ্য সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কতটা ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই ঘটনায় কত দ্রুত ও কতটা নিরপেক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণ করে।






