হাইলাকান্দি জেলার মহাদেবপুর জিপির নগ্ন দুর্নীতিকে কাঠগড়ায় তুলল নিঃস্ব পরিবার, বৃদ্ধা মাকে পরবাসী করে মাটির ঝুলন্ত কুঁড়েঘরে দিনমজুরের জীবনযুদ্ধ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ চারিদিকে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ আর ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’এর সরকারি প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে প্রচারের ঢাকঢোল। সরকারি বিজ্ঞাপনে দাবি করা হচ্ছে, দেশের প্রতিটি গৃহহীন ও অসহায় পরিবার আজ মাথা গোঁজার পাকা ছাদ পাচ্ছে। কিন্তু সেই চোখধাঁধানো বিজ্ঞাপনী প্রচারের আড়ালে কতটা ভয়াবহ ও উল্টো হতে পারে এক গ্রামীণ ভারতের নগ্ন বাস্তব তার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হাইলাকান্দি জেলার মহাদেবপুর জিপির অন্তর্ভুক্ত কালীনগর ষষ্ঠ খণ্ড এলাকা।
চারিদিকে যখন ইট-সিমেন্টের পাকা দালান গড়ে উঠছে, তখন আধুনিক অসমের বুক দাঁড়িয়ে চরম জীবনের ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে দিন কাটাচ্ছেন একটি পরিবার। ভেঙে পড়া, জরাজীর্ণ মাটির কুঁড়েঘরের নিচে এক ছাদের তলায় বাস করছেন দিনমজুর মোহাম্মদ আলী বড়ভূঁইয়া, তাঁর ভাই এবং দুই পরিবারের মোট আটজন সদস্য।
শুধু তাই নয়, তীব্র গরমে ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে জরাজীর্ণ ঘরের কারণে অসুস্থ ও বৃদ্ধা বিধবা মাকে নিজের কাছে রাখতে না পেরে মাসির বাড়িতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। আর এই বুকভাঙা করুণ পরিস্থিতির পেছনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের চরম উদাসীনতা, লাল ফিতের ফাঁস এবং প্রকাশ্য স্বজনপোষণের রাজনীতি।
মহাদেবপুর জিপির কালীনগর ষষ্ঠ খণ্ডের ৮ নম্বর গ্রুপের ৪৯(ক) নম্বর গৃহের বাসিন্দা প্রয়াত বশির উদ্দিন বড়ভূঁইয়ার পুত্র মোহাম্মদ আলী বড়ভূঁইয়া। পেশায় তিনি একজন অত্যন্ত সাধারণ দিনমজুর। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ এমন সংসারে নুন-ভাতের সংস্থান করতেই রোজ সকালে কাজে ছুটতে হয় দুই ভাইকে। সেখানে ইট-বালু কিনে নিজেদের উদ্যোগে একটি পাকা বাড়ি তৈরি করা তো দূরের কথা, চালের ফুটো মেরামত করার সামর্থ্যও তাঁদের নেই।
বাস্তব চিত্রটি আরও করুণ ও রোমহর্ষক। যে কাঁচা ঘরটিতে আটটি প্রাণ প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যান, সেটির পশ্চিম প্রান্তের মাটিতে কোনো মজবুত ভিত বা টিকসই দেয়াল অবশিষ্ট নেই। ঝুলন্ত অবস্থায় কাঠ ও লটকানো মাটির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে রয়েছে আস্ত ঘরটি। আকাশ মেঘলা হয়ে সামান্য বৃষ্টি নামলেই চাল ছিদ্র করে ঘরের ভেতরে ঝরে পড়ে জলের তোড়।
আর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের তীব্র ঝড়-বৃষ্টি বা কালবৈশাখী এলে আতঙ্কে রাত জাগেন পরিবারের সদস্যরা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো মুহূর্তে সামান্য ভূকম্পন বা ভারী বর্ষণে পাহাড়ঘেঁষা বা ঢালু অংশের মাটি ধসে পুরো ঘরটি মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারে। যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড়সড় প্রাণহানির অঘটন।
এমন এক নারকীয় পরিবেশে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠায় এবং ঘরের ভেতরে অবরুদ্ধ গরম সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ বৃদ্ধা বিধবা মাকে নিজের কাছে রাখতে পারেননি মোহাম্মদ আলী। অশ্রুসজল চোখে তিনি জানান, মায়ের এই বয়সে একটু সুচিকিৎসা ও শান্তিতে থাকার অধিকার ছিল, অথচ নিজের ঘরে জায়গা বা পরিবেশ না থাকায় তাঁকে মাসির বাড়িতে এনে রাখতে হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে বাধ্য হয়ে সংবাদমাধ্যমকে ডেকে নিজের সমস্ত দুঃখ ও ক্ষোভ উগরে দেন মোহাম্মদ আলী বড়ভূঁইয়া। তিনি নথিপত্র ও প্রমাণাদি তুলে ধরে জানান, প্রধানমন্ত্রী আবাসন যোজনার ২০১৮ সালের সরকারি তালিকায় তাঁর নাম স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল (গৃহ নং ৪৯ক)। কিন্তু দীর্ঘ আট বছর কেটে গেলেও সেই নাম কেবল ফাইলের পাতার ভেতরেই ধুলো জমিয়ে আটকে রয়েছে।
অভিযোগের তির স্থানীয় পঞ্চায়েত ও জনপ্রতিনিধিদের দিকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, বর্তমান সময়ে এলাকায় ব্যাপক স্বজনপোষণ চলছে। যাদের ইতোমধ্যেই পাকা বাড়ি রয়েছে, কিংবা যারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একবার বা দু-দু’বার সরকারি আবাসন প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন, তাঁদের অ্যাকাউন্টে অনায়াসে ঢুকছে সরকারি টাকা। অথচ যাদের মাথার ওপর ছাদ বলতে কিছুই নেই, আকাশ ভেঙে পড়লে যাদের আশ্রয় নেওয়ার জায়গা থাকে না, সেই প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলিকে বছরের পর বছর ধরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বঞ্চনার অন্ধকারে।
ঘরের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জিপি দপ্তরে চক্কর কাটছেন মোহাম্মদ আলী। কালীনগর ষষ্ঠ খণ্ডের গ্রুপ সদস্য তথা বর্তমান মহাদেবপুর জিপির সভাপতি নুরুল হক চৌধুরীর কাছে বহুবার আবেদন জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু প্রতিবারই জিপি সভাপতির কাছ থেকে মিলেছে একই মুখস্থ জবাব চিন্তা করবেন না, পেয়ে যাবেন, সিস্টেমে কাজ চলছে।
একইভাবে পঞ্চায়েত সচিব, গ্রাম রোজগার সেবক (জিআরএস) এবং অন্যান্য কর্মচারীদের কাছে বারংবার ধর্না দিলেও প্রত্যেকেই শুধু আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছেন। তাঁরা আশ্বাস দিয়েছেন, শীঘ্রই টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকে যাবে। কিন্তু সেই ‘শীঘ্র’ যে কত বছরে আসবে, তা জানা নেই কারও। পঞ্চায়েত অফিসের দরজায় ঘুরতে ঘুরতে হতাশ হয়ে পড়েছেন এই নিঃস্ব দিনমজুর।
পঞ্চায়েতি ব্যবস্থার এই প্রহসন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে এবার হাইলাকান্দির জেলাশাসক জয় বিকাশ এবং অসমের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরাসরি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আলী বড়ভূঁইয়া। তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, আমি মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ও জেলাশাসক মহোদয়ের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, আপনারা তদন্তকারী দল পাঠিয়ে আমার ঘরের পরিস্থিতি সরেজমিনে তদন্ত করুন। দেখুন কীভাবে আমরা আটজন মানুষ নরকযন্ত্রণা ভোগ করছি।
অবিলম্বে তদন্তের মাধ্যমে আমাদের প্রাপ্য প্রধানমন্ত্রী আবাসনের একটি পাকা ঘর মঞ্জুর করা হোক। তিনি আরও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, যদি প্রশাসন ও পঞ্চায়েত অবিলম্বে এই বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে পরিবারের সকল সদস্য এমনকি অসুস্থ বৃদ্ধা মাকে সাথে নিয়েই তিনি হাইলাকান্দির জেলাশাসকের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে অবস্থান নেবেন এবং বিচার চাইবেন।
উন্নয়নের হাজারো গালভরা দাবির মাঝে কালীনগরের এই জরাজীর্ণ ঘরের দৃশ্য এখন স্থানীয় প্রশাসনের কাজের স্বচ্ছতার ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সংবাদমাধ্যমে এই খবর প্রচারিত হওয়ার পর ঘুম ভাঙবে কি স্থানীয় প্রশাসনের, নাকি বরাবরের মতো ‘সিস্টেম’ এর অজুহাতে আরও এক অসহায় পরিবারের স্বপ্ন চাপা পড়ে থাকবে মাটির কুঁড়েঘরের ধ্বংসস্তূপে!






