বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৮ জুলাইঃ অসম সরকারের ঋণের পরিমাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহল, বিরোধী শিবির এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে জোর আলোচনা চলছে। বিরোধীদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে রাজ্য সরকারের ঋণের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার অসম বিধানসভার অধিবেশনে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়, যখন শিবসাগরের বিধায়ক অখিল গগৈ সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ এবং ঋণ গ্রহণের আর্থিক অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। বিধানসভায় অখিল গগৈয়ের প্রশ্নের লিখিত জবাব দেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী জয়ন্ত মল্ল বরুয়া। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, অসম সরকার কোনোভাবেই অনিয়ন্ত্রিত ঋণ গ্রহণ করেনি এবং সরকারের ঋণের পরিমাণ আইনসিদ্ধ সীমার মধ্যেই রয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্য সরকার মোট রাজ্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিএসডিপি) নির্ধারিত ৩২ শতাংশ সীমার মধ্যেই ঋণের পরিমাণ বজায় রেখেছে। তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও মহাহিসাব নিরীক্ষক (অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল) প্রকাশ করেননি। পাশাপাশি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষও এখনও চলমান থাকায়, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত রাজ্যের মোট ঋণের প্রকৃত ও চূড়ান্ত পরিসংখ্যান এই মুহূর্তে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে সর্বশেষ উপলব্ধ সরকারি তথ্য তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী জানান, মহাহিসাব নিরীক্ষকের ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে যে, ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত অসম সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ৬১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা।
তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র ঋণের পরিমাণ দেখেই আর্থিক অবস্থার বিচার করা উচিত নয়। সরকারের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং সুদ প্রদানের অবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে পুরনো ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে রাজ্যের মোট রাজস্ব আয়ের ৯.৭৭ শতাংশ, যা আর্থিক শৃঙ্খলার মধ্যেই রয়েছে বলে সরকারের দাবি।
অর্থমন্ত্রী জয়ন্ত মল্ল বরুয়া আরও বলেন, অসম সরকার কখনও ইচ্ছামতো ঋণ গ্রহণ করে না। প্রতিটি অর্থবর্ষে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষেই রাজ্য সরকার ঋণ গ্রহণ করে থাকে। ফলে ঋণ গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াই আইন ও আর্থিক নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়।
বিরোধীদের অন্যতম অভিযোগ ছিল, রাজ্যের ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই অভিযোগও খারিজ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ভারতের মহাহিসাব নিরীক্ষক (ক্যাগ) এর সর্বশেষ স্টেট ফিন্যান্স রিপোর্ট ২০২৪-২৫ এর কোথাও অসম সরকারের ঋণকে অনিয়ন্ত্রিত বলে উল্লেখ করা হয়নি। বরং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা নির্ধারিত সীমার মধ্যেই রয়েছে বলে প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়েছে।
ক্যাগের প্রতিবেদনের উল্লেখ করে তিনি জানান, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত রাজ্যের ঋণ-জিএসডিপি অনুপাত কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও তা আইনসিদ্ধ সীমা অতিক্রম করেনি। ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ অর্থবর্ষে এই অনুপাত এএফআরবিএম (অসম ফিসকাল রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড বাজেট ম্যানেজমেন্ট) আইনে নির্ধারিত ২৮.৫ শতাংশের মধ্যেই ছিল।
পরবর্তীতে এএফআরবিএম (সংশোধনী) আইন, ২০২২ কার্যকর হওয়ার পর ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত ঋণের সর্বোচ্চ সীমা জিএসডিপির ৩২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। অর্থমন্ত্রীর দাবি, ওই সংশোধিত সীমার মধ্যেই অসম সরকারের ঋণের পরিমাণ রয়েছে। ফলে সরকারের ঋণকে অনিয়ন্ত্রিত বা উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করার কোনো ভিত্তি নেই। অন্যদিকে, বিরোধী মহলের দাবি, ঋণের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে রাজ্যের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
যদিও সরকার এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছে, উন্নয়নমূলক প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পিতভাবেই ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে এবং সমস্ত আর্থিক সূচক এখনও আইন নির্ধারিত সীমার মধ্যেই রয়েছে।
বিধানসভায় এই প্রশ্নোত্তর পর্বের পর রাজ্যের ঋণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। একদিকে বিরোধীরা সরকারের ঋণনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে সরকার দাবি করছে, অসমের আর্থিক শৃঙ্খলা অটুট রয়েছে এবং সমস্ত ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন ও প্রচলিত আর্থিক বিধি মেনেই। ফলে আগামী দিনে এই ইস্যু রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।







