এক বছরে খরচ মাত্র ৮৭ লক্ষ, অনুদান ও সুদে আয় ১,২০০ কোটির বেশি, স্বচ্ছতা নিয়ে সোচ্চার বিরোধীরা
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ দুই বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে পিএম কেয়ার্স ফান্ডের ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের অডিট করা আর্থিক বিবরণী প্রকাশ্যে এল। ১৭ আগস্ট ফান্ডের ওয়েবসাইটে আপলোড করা নথি অনুযায়ী, ৩১ মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত পিএম কেয়ার্স ফান্ডের অ্যাকাউন্টে পড়ে ছিল ৮,৪৫২ কোটি টাকা। অথচ ওই অর্থবর্ষে ফান্ড থেকে খরচ হয়েছে মাত্র ৮৭ লক্ষ টাকা। বিপুল পরিমাণ অর্থ মজুত থাকা এবং ব্যয়ের তুলনামূলকভাবে অতি সামান্য পরিমাণ সামনে আসতেই ফের জোরালো হয়েছে ফান্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন।
২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের আর্থিক বিবরণী বলছে, অনুদান এবং জমা অর্থের ওপর পাওয়া সুদ মিলিয়ে ওই বছরে পিএম কেয়ার্স ফান্ডের আয় হয়েছে ১,২০০ কোটিরও বেশি টাকা। কিন্তু সেই তুলনায় খরচের পরিমাণ মাত্র ৮৭ লক্ষ টাকা। ফলে ফান্ডে জমা বিপুল অর্থের ব্যবহার, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং আর্থিক তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের অডিট করা আর্থিক বিবরণী দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে না আসায় পিএম কেয়ার্স ফান্ড নিয়ে আগেই প্রশ্ন উঠেছিল। অবশেষে ১৭ আগস্ট ফান্ডের ওয়েবসাইটে নথিগুলি প্রকাশ করা হয়। জানা গেছে, ৬ আগস্ট অ্যাকাউন্টের অডিট সম্পন্ন হয় এবং পরদিন, অর্থাৎ ৭ আগস্ট অডিটররা রিপোর্টে স্বাক্ষর করেন।
২০২০ সালের মার্চে কোভিড-১৯ মহামারি যখন দেশজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন জরুরি পরিস্থিতি ও দুর্যোগ মোকাবিলার উদ্দেশ্যে পিএম কেয়ার্স ফান্ড গঠন করা হয়। ফান্ড গঠনের পর প্রথম তিন বছরেই প্রায় ১৩,০০০ কোটি টাকা জমা পড়ে। এর মধ্যে প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা প্রথম সপ্তাহেই সংগ্রহ হয়েছিল। অর্থ সংগ্রহের সময় সরকার জানিয়েছিল, পিএম কেয়ার্স ফান্ডে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর-এর আওতায় অর্থ দেওয়া যাবে। সরকারি কর্মী ও আধিকারিকদেরও ফান্ডে বেতন দানের জন্য আবেদন জানানো হয়েছিল।
তবে ফান্ডের কার্যকলাপ ও আর্থিক তথ্য জানতে সাধারণ মানুষ আরটিআইয়ের আশ্রয় নেওয়ার পর শুরু হয় বিতর্ক। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, পিএম কেয়ার্স ট্রাস্ট কোনও ‘পাবলিক অথরিটি’নয়। ফলে তথ্যের অধিকার আইন বা আরটিআই-এর আওতায় ফান্ডকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা যায় না। এই অবস্থান নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতা ও জনজবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন। স্বচ্ছতার পক্ষে কাজ করা কর্মী অঞ্জলি ভরদ্বাজ-সহ একাধিক ব্যক্তি আদালত ও তথ্য কমিশনের মাধ্যমে পিএম কেয়ার্স ফান্ড সম্পর্কিত আরও তথ্য প্রকাশের চেষ্টা করেছেন।
এর মধ্যেই সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় বা পিএমও লোকসভা সচিবালয়কে জানিয়েছে, পিএম কেয়ার্স ফান্ড সম্পর্কিত প্রশ্ন এবং সংসদে এ নিয়ে করা অন্যান্য হস্তক্ষেপ লোকসভার কার্যপ্রণালী ও কার্য পরিচালনার নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে ফান্ড নিয়ে সংসদীয় নজরদারির প্রশ্নও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অতীতে তথ্য কমিশনগুলিও পিএম কেয়ার্স ফান্ডের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এমনকি এই পরিস্থিতির সঙ্গে নির্বাচনী বন্ড ব্যবস্থাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কেরও তুলনা টানা হয়েছে। নির্বাচনী বন্ডে দাতাদের পরিচয় গোপন রাখার ফলে জনসাধারণের কাছে জবাবদিহি সীমিত হয়ে পড়েছিল, এমন অভিযোগ উঠেছিল।
স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা মহলের আশঙ্কা, বিপুল পরিমাণ অনুদান যদি পর্যাপ্ত জনপর্যবেক্ষণ ও তদন্তের বাইরে থাকে, তাহলে অর্থের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়া বা ‘কুইড প্রো কো’ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্নীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে দুই বছর পর অডিট রিপোর্ট প্রকাশ্যে এলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, ৮,৪৫২ কোটি টাকার এই বিপুল তহবিল কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার ওপর কতটা কার্যকর জননজরদারি রয়েছে? বিপুল অর্থের মজুত, সামান্য ব্যয় এবং দীর্ঘ বিলম্বে অডিট রিপোর্ট প্রকাশ, এই তিনটি বিষয়ই পিএম কেয়ার্স ফান্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিতর্ককে ফের সামনে নিয়ে এসেছে।





