উচ্চশিক্ষার মান যাচাইয়ে ফেল মার্কার, ন্যাকের স্বীকৃতি ছাড়াই চলছে দেশের সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয়
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৮ আগষ্টঃ ভারতের ভবিষ্যৎ গড়ার তাগিদে প্রতি বছর কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে অঢেল অর্থ বরাদ্দের সুউচ্চ দাবি করা হয়। কিন্তু সেই বিপুল অঙ্কের সরকারি অনুদানের বড় একটি অংশ যে শ্রেণিকক্ষের আধুনিকীকরণ বা গবেষণাগারের মানোন্নয়নে পৌঁছানোর আগেই ফাইল ও প্রশাসনিক লালফিতার ফাঁসে বন্দি হয়ে থাকে তা আবার প্রমাণ করল নিয়ন্ত্রক ও মহা হিসাব পরীক্ষক (ক্যাগ)এর সাম্প্রতিকতম অডিট রিপোর্ট।
২০২২–২৩ অর্থবর্ষের আর্থিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে সংসদে পেশ করা এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে উঠে এসেছে এক করুণ ছবি, কেবল সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অভাবে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের অধীনস্থ স্বশাসিত সংস্থাগুলি চার হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ ব্যবহারই করতে পারেনি। তার ওপর, দেশের প্রথম সারির আইআইটি, আইআইএম এবং কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মকে তোয়াক্কা না করে কোটি কোটি টাকার তহবিল নয়ছয় ও আর্থিক অনিয়মের চাঞ্চল্যকর চিত্র জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়েছে।
ক্যাগের পেশ করা পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২–২৩ অর্থবর্ষে ভারত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক ও দফতরের অধীনে থাকা কেন্দ্রীয় স্বশাসিত সংস্থাগুলির জন্য মোট ১ লক্ষ ১৩ হাজার ১২ কোটি টাকা অনুদান মঞ্জুর করা হয়েছিল। এই সামগ্রিক বরাদ্দের সবচেয়ে সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৪৮.৪৩ শতাংশ (৫৪,৭৩২ কোটি ১৬ লক্ষ টাকা)অনুমোদন করা হয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রকের আওতাধীন ১৯৮টি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই বিশাল অর্থরাশির মধ্যে ৪ হাজার ৫৫৩ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকাই সম্পূর্ণ অব্যবহৃত ও অলস অবস্থায় পড়ে রইল।
কেন্দ্রের সমস্ত মন্ত্রক মিলিয়ে স্বশাসিত সংস্থাগুলির মোট অব্যবহৃত অনুদানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১২,৪৬৪ কোটি ২২ লক্ষ টাকা। তার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি (৩৩.৮২%) অবদান এককভাবে কেবল শিক্ষা মন্ত্রকের! যেখানে দেশের হাজার হাজার সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবকাঠামোগত ঘাটতি, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও আধুনিক গবেষণার সরঞ্জামের অভাবে ধুঁকছে, সেখানে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ওপর টাকা ফেরত যাওয়া বা বছরের পর বছর খরচ না হওয়া শিক্ষা প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা ও নজরদারির অভাবকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।
ক্যাগের অডিটে শুধু অর্থ খরচ না করার অদক্ষতাই নয়, আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও চরম গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে। সরকারি নীতি অনুযায়ী সময়সীমার মধ্যে প্রতিটি স্বশাসিত সংস্থাকে তাদের অডিট রিপোর্ট পেশ করা বাধ্যতামূলক। অথচ, শিক্ষা মন্ত্রকের অধীনস্থ ১৯৮টি স্বশাসিত সংস্থার মধ্যে ১০২টি সংস্থাই নির্ধারিত ৩০ জুনের সময়সীমা পার হওয়ার পর তাদের বার্ষিক হিসাব জমা দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, ৯১টি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষিত হিসাব ও প্রশাসনিক পর্যালোচনা রিপোর্ট নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদেই পেশ করা হয়নি। অডিটরদের মতে, কোটি কোটি টাকার সরকারি খরচের ওপর নজরদারি এড়াতেই কি এই ধরনের ইচ্ছাকৃত প্রশাসনিক বিলম্ব?
দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পঠনপাঠন ও পরিকাঠামোর গুণমান যাচাই করার সর্বোচ্চ সংস্থা ‘জাতীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ’ বা ন্যাক এর পারফরম্যান্স নিয়েও ক্যাগ রিপোর্ট কড়া চাবুক চালিয়েছে। ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের মাত্র ৩১.৯২ শতাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ন্যাকের স্বীকৃতি লাভ করেছিল। যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ৫৬.২৬ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৭৬.২২ শতাংশ কলেজ কোনো আবেদন বা মূল্যায়নই করায়নি। দেশের ১৬১টি ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান’-এর (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব ইম্পর্ট্যান্স) মধ্যে মাত্র ৭টি প্রতিষ্ঠানের বৈধ ন্যাক স্বীকৃতি ছিল।
প্রতি বছর ২,৫০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, ২০২০–২১ সালে অর্জিত হয়েছিল মাত্র ১২.৭৬ শতাংশ এবং ২০২৩–২৪ সালে তা ৭৯.২৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের মাত্র ২৫.৭১ শতাংশ (১১,৫৮আইটি) উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ন্যাক স্বীকৃত ছিল। এমনকি ৫৫৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে মেয়ার উত্তীর্ণ বা বাতিল হয়ে যাওয়া ন্যাক স্বীকৃতির সার্টিফিকেট প্রদর্শন করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছিল, যা রোধে শিক্ষা মন্ত্রক কোনো কার্যকর পদক্ষেপই নেয়নি।
ক্যাগের রিপোর্ট প্রমাণ করেছে যে, ব্র্যান্ডের নাম যতই বড় হোক না কেন, আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে অনিয়ম থেকে মুক্ত নয় আইআইটি বা আইআইএমের মতো ভারতের ‘প্রিমিয়ার’ প্রতিষ্ঠানগুলোও। নির্দিষ্ট কয়েকটি নজিরবিহীন ঘটনার কথা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, সঞ্চিত পেশাগত উন্নয়ন ভাতা (সিপিডিএ)র নিয়ম লঙ্ঘন করে শিক্ষাবিদ ও আধিকারিকদের ব্যক্তিগত গ্যাজেট (ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, ট্যাবলেট) কেনার জন্য ১ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকা বিলানো হয়েছে। এর মধ্যে এককভাবে আইআইটি বম্বে দিয়েছে ৭৩.৮১ লক্ষ টাকা, আইআইটি গুয়াহাটি দিয়েছে ১০.৩৩ লক্ষ টাকা এবং সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, কোকরাঝাড় দিয়েছে ৫০.৩১ লক্ষ টাকা। ক্যাগের স্পষ্ট অভিমত, এই তহবিলের টাকা দিয়ে ব্যক্তিগত কম্পিউটার কেনা সম্পূর্ণ বেআইনি।
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইআইএসইআর) কলকাতা কোনো প্রকার মন্ত্রকীয় পূর্বানুমতি ছাড়াই একটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সংস্থাকে বেসরকারি স্কুল চালানোর জন্য ৩ একর মূল্যবান জমি এবং ১২ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা মূল্যের রাষ্ট্রীয় ভবন ব্যবহার করতে দেয়। এর ফলে সরকারি রাজকোষ সম্ভাব্য ৬ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার নিশ্চিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট (আইআইএম) মুম্বাই তাদের ঋণ পরিশোধের জন্য নির্ধারিত অর্থ সময়মতো স্বল্পমেয়াদি ফিক্সড ডিপোজিটে বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হয়।
এর ফলে অলস পড়ে থাকা টাকার ওপর সুদের বাবদ প্রতিষ্ঠানের ৫৮.৭১ লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত চালাতে গিয়ে দেখা যায়, ২,৭১১টি কেনাকাটার বিলের মধ্যে ৭৮৬টি মূল সামগ্রী বা সরঞ্জামের কোনো বাস্তব অস্তিত্বই নেই! আরও ৩৮৭টি সামগ্রী ভৌতভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সেখানে ৫৮.৮৭ লক্ষ টাকার সামগ্রী কম পেয়েও পুরো টাকা মেটানো হয়েছে, প্রকৃত খরচের চেয়ে ২ কোটি ১ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত প্রদান করা হয়েছে এবং পর্যাপ্ত বিল-ভাউচার ছাড়াই ৩ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অফ কাশ্মীর আউটসোর্সিং বা নিয়োগকারী এজেন্সিগুলোকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ছুটি নগদীকরণের টাকা ফেরত দিয়ে প্রতিষ্ঠানের ৭৬.৩১ লক্ষ টাকার বড়সড় আর্থিক ক্ষতি সাধন করেছে।
ক্যাগের এই বিস্ফোরক অডিট রিপোর্ট ভারতের শিক্ষা কাঠামোর এক নগ্ন সত্যকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে যখন কোটি কোটি টাকা খরচ না হয়ে ফেরত যাচ্ছে, অন্যদিকে যে অর্থ খরচ করা হচ্ছে তাতেও স্বচ্ছতার তীব্র অভাব ও দুর্নীতির স্পষ্ট গন্ধ। দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি নূন্যতম আর্থিক অনুশাসন বজায় না থাকে, তবে সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বায়নের দাবি কতটুকু যুক্তিযুক্ত সেই নিয়েই এখন সরব সচেতন নাগরিক সমাজ।





