অনুমতি ছাড়াই বুলডোজার চালিয়ে লক্ষাধিক চা গাছ ও পাহাড় ধ্বংস, আলোচনার আশ্বাস দিয়েও নিরুদ্দেশ এসডিও!
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৬ আগষ্টঃ সরকারি উন্নয়নমূলক কাজের দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন চা বাগান ধ্বংসের এক অভূতপূর্ব ও আশঙ্কাজনক অভিযোগ উঠল কাছাড় জেলার লক্ষীপুর মহকুমায়। বরাক টি কোম্পানি লিমিটেডের মালিকানাধীন ঐতিহ্যবাহী দিলখুশ চা বাগানের বুক চিরে একটি গ্রামীন সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ জোরকদমে চললেও, বাগান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ধরণের পূর্ব অনুমতি বা নো অবজেকশন সার্টিফিকেট নেওয়া হয়নি বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। খোদ পূর্ত বিভাগের এমন একতরফা ও আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানো ভূমিকায় ক্ষুব্ধ বাগান মালিক বর্ষীয়ান শিল্পপতি অনিল গোয়েঙ্কা। পরিস্থিতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে বাধ্য হয়ে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গোয়েঙ্কা সাহেবের অভিযোগ ঘিরে লক্ষীপুরের সরকারি দপ্তরগুলোর কাজকর্ম নিয়ে চরম প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাবশালী মন্ত্রীদের নাম ভাঙিয়ে এখানে একের পর এক বেআইনি কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে বিভিন্ন দপ্তর। ২০১৩ সালে একটি আইসিডিএস কেন্দ্র নির্মাণের জন্য এনওসি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরে ভুয়ো ও জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে সেই পুরানো এনওসি ব্যবহার করে নির্মাণকাজ চালানো হয়। অথচ আইনি নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো এনওসি-র কার্যকারিতার মেয়াদ সর্বোচ্চ ৫ বছর।
চলতি বছর কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করে পূর্ত বিভাগ। অথচ জমি বা বাগানের ক্ষতি নিয়ে চা বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিন্দুমাত্র যোগাযোগ করার প্রয়োজনবোধ করেনি পূর্ত বিভাগ। সরকারি উন্নয়নমূলক কাজে বাধা দেওয়ার কোনো মানসিকতা আমাদের নেই। কিন্তু নিয়মনীতি জলাঞ্জলি দিয়ে গায়ের জোরে কাজ করা কখনো মেনে নেওয়া যায় না। আজ যদি বাগানের জমি এভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, কাল সাধারণ মানুষের জমিও একইভাবে বেপরোয়াভাবে দখল হবে। পূর্ত বিভাগের আধিকারিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেন বরাক টি কোম্পানি লিমিটেডের কর্ণধার অনিল গোয়েঙ্কা|
আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে অনিল গোয়েঙ্কা সমস্যার সমাধানে ধারাবাহিকভাবে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু একের পর এক স্মারকপত্র ও আবেদনের পরও কার্যত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। ১৮ ফেব্রুয়ারি লক্ষীপুর পূর্ত বিভাগের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের কাছে একটি স্মারকপত্র প্রদান করা হয়। এর অনুলিপি পাঠানো হয় কাছাড়ের জেলাশাসক ও লক্ষীপুরের সম-জেলাশাসকের কাছেও।
কিন্তু কোনো পক্ষ থেকেই কোনো উত্তর বা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এরপর ১৮ মার্চ, পূর্ববর্তী স্মারকপত্রের সূত্র উল্লেখ করে পুনরায় চিঠি দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৩ মার্চ পূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে শুধু জানানো হয় যে এটি সরকারি কাজ এবং সেই কারণে এনওসি প্রদান করতে হবে।
কিন্তু বিষয়টি নিয়ে উপযুক্ত সমাধান ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে ২০ এপ্রিল পুনরায় স্মারকপত্র প্রদান করা হয়। সেখানে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এনওসি দেওয়ার প্রস্তাবও রাখা হয়। তা সত্ত্বেও কোনো কার্যকর যোগাযোগ বা সমাধান ছাড়াই কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়। পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে ২৭ জুলাই অনিল গোয়েঙ্কার পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা জারি করা হয়।
সেখানে দাবি পূরণ না হলে কাজ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও স্পষ্টভাবে জানানো হয়। তবে এতগুলি আবেদন, স্মারকপত্র ও সতর্কবার্তার পরও এখনও পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। ফলে আইনের প্রতি আস্থা রেখে প্রশাসনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের জন্য ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেলেও কার্যত সেই প্রচেষ্টা এখনও ফলপ্রসূ হয়নি।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, ১৯৬৪ সালে ব্রিটিশ লর্ড কার্জনের ভাগ্নি মেকিলা বেরির কাছ থেকে এই ঐতিহাসিক দিলখুশ চা বাগানটি ক্রয় করেছিলেন অনিল গোয়েঙ্কা। বিগত ছয় দশক ধরে পরম মমতায় তিলে তিলে তিনি এই বাগানকে সমৃদ্ধ করেছেন। অথচ আজ প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণের নামে কোনো রকম নিয়ম না মেনে বাগানের লক্ষাধিক চা চারা, মূল্যবান বাঁশঝাড় এবং প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা পাহাড় কেটে একাকার করে দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ ও অর্থনীতির এমন অপূরণীয় ক্ষতি দেখে আক্ষেপ ঝরে পড়েছে বর্ষীয়ান এই চা ব্যবসায়ীর কণ্ঠে। বর্তমানে কলকাতায় বসবাসকারী অনিল গোয়েঙ্কা সম্প্রতি বিশেষ কাজে শিলচরে আসেন এবং সেখান থেকে লক্ষীপুরে গিয়ে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখে ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, এই বিষয়ে লক্ষীপুর পূর্ত বিভাগের এসডিও ফখরুলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, মালিক অনিল গোয়েঙ্কা স্থানীয়ভাবে থাকেন না বলেই এনওসি নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে গোয়েঙ্কা শিলচরে এসেছেন জেনে তিনি মুখোমুখি আলোচনায় বসার আগ্রহ দেখান। সেই অনুযায়ী বৃহস্পতিবার রাত সাতটায় শিলচরের ‘বড়াইল ভিউ’-তে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সময়ও চূড়ান্ত হয়। কিন্তু নাটকের শেষ এখানেই নয়! অনিল গোয়েঙ্কা যথাসময়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করলেও, পূর্ত বিভাগের এসডিও ফখরুল সেখানে আসেননি। এমনকি পরবর্তীতে অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ফোনও ধরেননি তিনি। ফলে বাধ্য হয়ে খালি হাতে ফিরে আসতে হয় বাগান কর্তৃপক্ষকে।
আমলাতন্ত্রের এমন উদাসীন ও বেপরোয়া মনোভাব দেখে গভীরভাবে মর্মাহত গোয়েঙ্কা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মালিক হয়েও যদি নিজের সম্পত্তির কোনো সুরক্ষা বা গুরুত্ব না থাকে, তবে আর কী বাকি রইল? আইনকানুন ও সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যেভাবে লক্ষীপুর পূর্ত বিভাগ চা বাগানের জমিতে তাণ্ডব চালাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে এখন আদালতই শেষ ভরসা। অত্যন্ত দ্রুত তিনি এই বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। এখন দেখার, আদালতের হস্তক্ষেপের পর পূর্ত বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তারা তাঁদের এই অদ্ভুত ও স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের কী কৈফিয়ত দেন!





