আহত শিশু শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, উত্তেজিত জনতার হাতে ধরা পড়ে পুলিশের হেফাজতে অভিযুক্ত, দ্রুত বিচারের দাবিতে সরব এলাকাবাসী
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ জুলাইঃ মানবিকতা, নৈতিকতা এবং সভ্য সমাজের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেওয়া এক হৃদয়বিদারক ঘটনার অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছে ধলাই থানা এলাকার পানিভারা গ্রাম পঞ্চায়েতের পুরুরথল পুঞ্জি। মাত্র ৬ বছরের এক শিশুকন্যার ওপর পাশবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে ৩৫ বছর বয়সী প্রদীপ কালিন্দীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই গোটা এলাকায় নেমে আসে শোক, ক্ষোভ ও তীব্র প্রতিক্রিয়ার ঢেউ।
অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সরব হয়ে ওঠেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে এবং ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। গুরুতর আহত শিশুকন্যা বর্তমানে শিলচর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা তাঁর শারীরিক অবস্থার ওপর নিবিড় নজর রাখছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নির্যাতিত শিশুর বাবা কর্মসূত্রে গুয়াহাটিতে থাকেন। পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব সামলাতে শিশুটির মা প্রতিদিনের মতো সেদিনও পাশের জঙ্গলে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন। বাড়িতে একা ছিল মাত্র ছয় বছরের শিশুটি। অভিযোগ, এই সুযোগেরই অপব্যবহার করে অভিযুক্ত প্রদীপ কালিন্দী বাড়িতে প্রবেশ করে শিশুটির ওপর নৃশংস নির্যাতন চালায়।
কিছুক্ষণ পরে বাড়ি ফিরে শিশুটির অস্বাভাবিক কান্না, শারীরিক অসুস্থতা এবং আঘাতের চিহ্ন দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন মা। কী ঘটেছে জানতে চাইলে শিশুটি অভিযোগ অনুযায়ী তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা জানায়। এরপরই তিনি গুয়াহাটিতে থাকা স্বামীকে ফোনে বিষয়টি জানান এবং প্রতিবেশীদের খবর দেন। মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাটি গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা, সমাজকর্মীরা এবং হিন্দুত্ববাদী নেতা অমলেন্দু দাস ঘটনাস্থলে পৌঁছান। অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্তের বাড়িতে গিয়ে তাকে ধরার চেষ্টা করা হলেও, ততক্ষণে সে পালিয়ে যায়। একই সময়ে খবর পেয়ে ধলাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সর্বেশ্বর কুয়াড় পুলিশ বাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত শিশুটিকে দ্রুত উদ্ধার করে শিলচর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠান। পাশাপাশি অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করা হয়।
তদন্ত চলাকালীন বুধবার সকালে খবর আসে, অভিযুক্ত প্রদীপ কালিন্দী রুকনি বাংলা টিলা এলাকার একটি জঙ্গলে আত্মগোপন করে রয়েছে। খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে গিয়ে তাকে ঘিরে ফেলেন। অভিযুক্তকে দেখে উত্তেজিত জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং তাকে মারধর করে বলে জানা গেছে। পরে ধলাই থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্তকে জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, অভিযুক্ত প্রদীপ কালিন্দীর প্রথম স্ত্রী ও দুই সন্তান রুকনি বাগান এলাকায় বসবাস করেন। অভিযোগ, তাঁদের ছেড়ে তিনি অন্য এক মহিলাকে বিয়ে করে পুরুরথল পুঞ্জিতে ভাড়াবাড়িতে থাকছিলেন। তদন্তকারীরা তাঁর অতীত জীবন, সামাজিক যোগাযোগ এবং এই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়ও খতিয়ে দেখছেন। ঘটনার পর ধলাই এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে।
বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সচেতন নাগরিকরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন। পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে কঠোর নজরদারি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্রিয় ভূমিকার দাবিও উঠেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, নির্যাতিত শিশুর চিকিৎসা-সংক্রান্ত রিপোর্ট, ফরেনসিক তথ্য, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার পর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে পুলিশ বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি নয়। এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নয়, সমগ্র সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের জন্য নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
একটি সভ্য সমাজে এমন অভিযোগের নিরপেক্ষ, দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত যেমন অপরিহার্য, তেমনি অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীর বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণও সমানভাবে জরুরি। ধলাইয়ের এই মর্মান্তিক ঘটনায় সমগ্র এলাকাজুড়ে শোক ও ক্ষোভের আবহ বিরাজ করছে। সকলের একটাই দাবি, শিশুটির সুস্থতা নিশ্চিত হোক, তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন হোক এবং আইন অনুযায়ী দোষী ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে একটি শক্ত বার্তা সমাজের সামনে পৌঁছে যায়।






