ফাটক বাজার, সদর থানা পর্যন্ত ছড়ানো নেশার রমরমা, পুলিশি অভিযানের পরও থামছে না প্রবণতা
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১০ জুনঃ বরাক উপত্যকার কাছাড় জেলার সদর শহর শিলচরে মাদকসেবনের অভিযোগ সংবলিত কিছু ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রাতের অন্ধকারে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যে মাদকসেবনের দৃশ্য ধরা পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিও ও ছবিগুলিতে শিলচর সদর থানা সংলগ্ন এলাকা, ফাটক বাজারসহ শহরের কয়েকটি ব্যস্ত ও জনবহুল স্থানের উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দৃশ্য সামনে আসার পর শহরজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলছেন, যদি শহরের কেন্দ্রস্থল এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতেই এমন কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে ঘটতে পারে, তাহলে মাদক সমস্যার প্রকৃত চিত্র কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদকের বিস্তার সমাজের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদকের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা নিয়ে অভিভাবক মহলে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রকাশ্যে মাদকসেবনের অভিযোগ শুধু আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নই নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। সচেতন নাগরিকদের মতে, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই ঘটনাগুলির সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় তদন্ত চালানো জরুরি।
পাশাপাশি মাদক চক্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অভিযান, নিয়মিত নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। শহরবাসীর বক্তব্য, মাদকমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ গঠনের স্বার্থে প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অন্যথায় মাদকের বিস্তার সামাজিক অবক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে। ভাইরাল হওয়া ভিডিও ও ছবিগুলি ঘিরে জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বরাক উপত্যকায় মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু বিক্রিই নয়, সেবনের ঘটনাও প্রতিদিনের মতো সাধারণ ঘটনায় পরিণত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও কোনো পরিবারের সদস্যের মৃত্যুর খবর আসছে, এর অনেকটাই নেশাজনিত কারণে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে প্রশাসন ও পুলিশ।
যদিও পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদকদ্রব্য বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে এবং পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে, তবুও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে স্বীকার করতে হচ্ছে স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের একাংশকেও। পুলিশ আরও জানিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনেককে নেশামুক্তি ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনিক সূত্রের বাইরে থাকা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক মহলের অভিযোগ, পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে ফিরে আসার পরও অনেকেই আবার পুরনো নেশার জগতে ফিরে যাচ্ছে। ফলে পুনর্বাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
একজন স্থানীয় সমাজকর্মীর বক্তব্য, শুধু ধরপাকড় করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মূল চক্রকে চিহ্নিত না করলে এবং তাদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভাঙা না গেলে পরিস্থিতি বদলাবে না। তার মতে, মাদক বিরোধী অভিযান যতটা দৃশ্যমান, বাস্তব তেমন কিছু দেখা যায় না, এমন ধারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে সচেতন নাগরিকদের একাংশের দাবি, প্রশাসনের উদ্যোগ থাকলেও তা সমন্বিত নয়।
স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতা কর্মসূচি, ঝুঁকিপূর্ণ যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা—এসব ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। তাদের মতে, শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকল্প তৈরি করেই মাদক সমস্যাকে রোখা সম্ভব। এদিকে, সংবাদনিবন্ধকারীদের একাংশ বলছেন, মাদক চক্রের অর্থের উৎস এবং সরবরাহ শৃঙ্খল যদি কার্যকরভাবে ভাঙা না যায়, তাহলে বরাক উপত্যকাকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্য বাস্তবে কঠিন হয়ে পড়বে। তারা মনে করছেন, নিচুতলার বিক্রেতাদের ধরা হলেও মূল নেটওয়ার্ক অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, শিলচরের বর্তমান চিত্র এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়া মাদক সেবনের দৃশ্য শুধু আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নই তুলছে না, বরং সামাজিক অবক্ষয়ের দিকেও সতর্ক সংকেত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন এই পরিস্থিতিকে কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারে, নাকি এই সংকট আরও গভীরতর রূপ নেবে। এখন সকলের নজর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেঘটনার তদন্ত, দোষীদের শনাক্তকরণ এবং মাদকবিরোধী অভিযানে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটাই দেখার বিষয়।





