জনতার হাতে ধৃত দুই অভিযুক্ত, উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের লাঠিচার্জ, উদ্ধার চুরি হওয়া গরু ও বাজেয়াপ্ত ওয়াগনার
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২মেঃ শ্রীভুমি জেলার রামকৃষ্ণনগর সমজেলার রাতাবাড়ি থানার অধীন লালছড়া চা বাগান এলাকায় রবিবার দিনদুপুরে সংঘটিত এক দুঃসাহসিক গরু চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানানো এই ঘটনায় চুরি করা গরু নিয়ে পালানোর সময় প্রায় ২০ কিলোমিটার ধাওয়ার পর একটি ওয়াগনার গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সিংলা নদীতে পড়ে যায়।
পরে উত্তেজিত জনতা দুই অভিযুক্তকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লালছড়া চা বাগান এলাকার বাসিন্দা মতিলাল রবিদাসের একটি গরু দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন ছিল। রবিবার দুপুরে সুযোগ বুঝে একদল দুষ্কৃতকারী গরুটি চুরি করে একটি ওয়াগনার গাড়িতে তুলে দ্রুত এলাকা ত্যাগের চেষ্টা করে। বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসতেই শুরু হয় ধাওয়া।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গাড়িটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক অতিক্রম করে পালানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিভিন্ন এলাকার মানুষ সতর্ক হয়ে ওঠেন এবং অভিযুক্তদের গতিবিধির উপর নজর রাখতে থাকেন। এক পর্যায়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ ধাওয়া করার পর দরগারবন্দ এলাকার কাছে পৌঁছে গাড়িচালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ফলে গাড়িটি সোজা সিংলা নদীর মধ্যে পড়ে যায়। ঘটনার পর মুহূর্তেই এলাকায় শত শত মানুষের ভিড় জমে যায়। নদীতে পড়ে যাওয়া গাড়ি থেকে দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে উত্তেজিত জনতা আটকে রাখেন। পরে তাদের পরিচয় জানা যায়। ধৃতরা হলেন পাথারকান্দি থানার এলাকার বাসিন্দা আমরুল ইসলাম (২৫) এবং কুবাদউদ্দিন (৩৮)।
এদিকে খবর পেয়ে রাতাবাড়ি থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে অভিযুক্তদের নিয়ে যাওয়ার সময় উত্তেজিত জনতার একাংশ পুলিশের সঙ্গে বচসা ও ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই গরু চুরি ও চোরাচালান চক্র সক্রিয় থাকলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে জনরোষ চরমে পৌঁছায়। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা আহত হন বলে জানা গেছে। যদিও আহতদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে সরকারি ভাবে কোনও তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ঘটনার জেরে কিছু সময়ের জন্য এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নদীতে পড়ে যাওয়া ওয়াগনার গাড়িটি উদ্ধার করে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে চুরি হওয়া গরুটিকেও জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। গরুর মালিক মতিলাল রবিদাসের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে রাতাবাড়ি থানায় মামলা রুজু করা হয়েছে এবং ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী এবং দুর্গম এলাকাগুলিতে দীর্ঘদিন ধরেই গবাদিপশু চুরি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায়শই কৃষক ও শ্রমজীবী পরিবারগুলোর একমাত্র সম্পদ হিসেবে থাকা গরু চুরি হয়ে যাচ্ছে।
অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এই ঘটনা কেবল একটি গরু চুরির ঘটনা নয়; বরং গ্রামীণ এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গবাদিপশু চোর চক্রের দৌরাত্ম্য এবং জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতিফলন। দিনের আলোয় জনবহুল এলাকা থেকে গরু চুরি করে পালানোর সাহস দেখানোই প্রমাণ করে যে অপরাধী চক্র কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে ধৃত দুই অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চুরির সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের খোঁজ চালাচ্ছে পুলিশ। তদন্তকারীদের ধারণা, এর পিছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকতে পারে। পুলিশ পুরো ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে এবং শীঘ্রই আরও গ্রেপ্তার হতে পারে বলে সূত্রের খবর। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, যদি জনতার তৎপরতা না থাকত, তবে কি চুরি হওয়া গরু উদ্ধার হতো? আর কতদিন গ্রামীণ মানুষকে নিজেদের সম্পদ রক্ষায় এভাবেই রাস্তায় নেমে অপরাধীদের ধাওয়া করতে হবে? প্রশাসনের কাছে এখন এলাকাবাসীর একটাই দাবি, গবাদিপশু চুরি রোধে কঠোর ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।






