পলাতক বাড়ির মালিক সত্যজিৎ শর্মা, একাধিক ব্যক্তিকে প্রতারণার অভিযোগে তীব্র চাঞ্চল্য
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২০ মেঃ শিলচর শহরের দাস কলোনি এলাকায় এক চাঞ্চল্যকর প্রতারণার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার বিকেলে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শিলচর সদর আদালতের নির্দেশে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের উপস্থিতিতে বাড়ি মালিক সত্যজিৎ শর্মার বাড়ি সিল করে তালাবদ্ধ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে জমি-বাড়ি সংক্রান্ত প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত সত্যজিৎ শর্মা বর্তমানে পলাতক বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দাস কলোনির ওই বাড়ি ও জমি বিক্রির প্রস্তাব দেন সত্যজিৎ শর্মা। সেই সময় স্বপন ঘোষ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে বায়না চুক্তি সম্পন্ন হয়। অভিযোগ, বায়নার পর বিভিন্ন সময়ে অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে নগদ অর্থ দাবি করতে থাকেন সত্যজিৎ শর্মা। স্বপন ঘোষের দাবি, কখনও চিকিৎসার খরচ, কখনও পারিবারিক সমস্যার কথা বলে ধাপে ধাপে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়। বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই এই প্রতারণা সংঘটিত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুধুমাত্র স্বপন ঘোষ নন, একই কৌশলে আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে সত্যজিৎ শর্মার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে শ্রীভূমি জেলার একাধিক ব্যক্তিকে জমি বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিয়ে আর্থিকভাবে প্রতারিত করার অভিযোগ সামনে এসেছে। ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে ঘিরে একাধিক মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।
এলাকাবাসীর একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই পরিকল্পিতভাবে জমি ও বাড়ি সংক্রান্ত প্রতারণার জাল বিস্তার করা হয়েছিল। একই সম্পত্তি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রির প্রতিশ্রুতি, নগদ অর্থ গ্রহণ এবং পরে বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ এই পদ্ধতিই নাকি ছিল মূল কৌশল। যদিও অভিযুক্ত পক্ষের তরফে এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
স্বপন ঘোষ আদালতের দ্বারস্থ হলে বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। তিনি বায়না বাতিল, আর্থিক প্রতারণা এবং সম্পত্তি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরির অভিযোগ এনে শিলচর সদর আদালতে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের বিচারপ্রক্রিয়া ও নথিপত্র পর্যালোচনার পর আদালত অন্তর্বর্তী নির্দেশে জানায়, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত উক্ত সম্পত্তি আদালতের হেফাজতেই থাকবে।
আদালতের সেই নির্দেশ কার্যকর করতেই মঙ্গলবার বিকেলে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিকেলের দিকে বিশাল পুলিশবাহিনী ও প্রশাসনিক আধিকারিকরা দাস কলোনির ওই বাড়িতে পৌঁছান। পরে আদালতের নির্দেশ পাঠ করে শোনানোর পর বাড়ির মূল ফটক ও বিভিন্ন অংশে সরকারি সিল-মোহর লাগিয়ে তালাবদ্ধ করা হয়। ঘটনাস্থলে সাধারণ মানুষের ভিড় জমে যায় এবং এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এদিকে, সত্যজিৎ শর্মার হদিস না মেলায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, আদালতের নির্দেশের আগাম আভাস পেয়েই তিনি আত্মগোপন করেছেন। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠার পরও তিনি নাকি একই সম্পত্তি অন্য এক ব্যক্তির কাছে বিক্রির পরিকল্পনা করেছিলেন। এই অভিযোগ সামনে আসতেই প্রতারণার মাত্রা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আইনজীবী মহলের একাংশের মতে, এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত জমি-বিতর্ক নয়, বরং শহরে ক্রমবর্ধমান অনিয়ন্ত্রিত জমি-বাণিজ্য এবং দুর্বল নথি যাচাই ব্যবস্থার দিকেও আঙুল তুলছে। অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ পর্যাপ্ত আইনি পরামর্শ ছাড়াই জমি বা বাড়ির বায়না চুক্তিতে প্রবেশ করেন। ফলস্বরূপ প্রতারণার শিকার হলেও পরে দীর্ঘ আইনি লড়াই ছাড়া আর কোনও পথ খোলা থাকে না।
শহরের সচেতন মহলের বক্তব্য, “জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই ব্যবস্থা না থাকলে এ ধরনের প্রতারণা আরও বাড়বে। একই সম্পত্তি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রির অভিযোগ নতুন নয়, কিন্তু প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে প্রতারকচক্র বারবার সুযোগ পাচ্ছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, চূড়ান্ত আইনি রায়ের পর সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা কার নামে স্বীকৃত হবে? সত্যজিৎ শর্মা, নাকি বায়নাকারী স্বপন ঘোষ? আদালত ও তদন্তকারী সংস্থা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
প্রয়োজনে আরও ফৌজদারি মামলা ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলেও প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিলচর শহরে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে জমি-বাড়ির লেনদেনে আইনি সচেতনতার অভাব কত বড় বিপদের কারণ হতে পারে। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ প্রতারণার জালে হারিয়ে যাওয়ার আগে প্রশাসনের আরও কঠোর ভূমিকা এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার দাবি উঠতে শুরু করেছে বিভিন্ন মহলে।





