বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ মেঃ কাটিগড়া বিধানসভা সমষ্টিতে দরিদ্র মানুষের ঘরে সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার যে মহৎ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল, সেই প্রকল্পকেই ঘিরে এবার উঠল ভয়ঙ্কর দুর্নীতির অভিযোগ। অভিযোগের তীর সরাসরি কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কুশিয়ারকুল এলাকার বাসিন্দা নিরুপম নাথ এবং তাঁর সহযোগী বলে অভিযুক্ত জয় দাসের বিরুদ্ধে। আর এই অভিযোগ সামনে আসতেই সমগ্র এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বহুবার স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, দরিদ্র সীমারেখার নিচে বসবাসকারী পরিবারগুলিকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা হবে। এমনকি কাটিগড়ার বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ নিজেও বিভিন্ন সভা ও জনসংযোগ কর্মসূচিতে বারবার কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, কোনো দরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে বিদ্যুৎ সংযোগের নামে টাকা নেওয়া হলে কাউকে রেয়াত করা হবে না। তিনি বিভাগীয় কর্মচারী থেকে শুরু করে স্থানীয় দালালচক্র সকলকেই সতর্ক করেছিলেন।
অভিযোগ, সরকারি সেই বিনামূল্যের প্রকল্পকে হাতিয়ার করেই অসহায় মানুষের কাছ থেকে প্রকাশ্যে টাকা আদায়ের মতো গুরুতর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। আর এই অভিযোগ এবার সামনে এনেছেন কাটিগড়া সমষ্টির কুশিয়ারকুল জিপির অন্তর্গত বিশ্বম্ভরপুর গ্রামের এক হতদরিদ্র পরিবার। ভুক্তভোগী দীপক দাস ও তাঁর স্ত্রী চঞ্চলা রানী দাসের অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিরুপম নাথ ও জয় দাস তাঁদের কাছ থেকে মোট পনেরশো টাকা দাবি করেন। পরিবারটি জানায়, চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও বিদ্যুতের আলো পাওয়ার আশায় তারা ধারদেনা করে এক হাজার টাকা জোগাড় করে নিরুপম নাথের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু অভিযোগ, টাকা নেওয়ার পরও আজ পর্যন্ত তাঁদের ঘরে কোনো বিদ্যুৎ মিটার বসানো হয়নি।
ভুক্তভোগীর সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ, বাকি পাঁচশো টাকা না দিলে নাকি মিটারই বসানো হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে পরিবারটিকে! একদিকে সরকার বলছে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ, অন্যদিকে বাস্তবে গরিব মানুষের কাছ থেকে উৎকোচ আদায়ের অভিযোগ, স্বাভাবিকভাবেই এতে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের বক্তব্য, গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি প্রকল্পকে যদি এভাবেই টাকার মেশিনে পরিণত করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?
এলাকার বহু মানুষের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই কিছু তথাকথিত প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারি প্রকল্পের সুযোগ নিয়ে দরিদ্র মানুষের অসহায়তাকে পুঁজি করে চলেছেন। কেউ ঘর পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা নেয়, কেউ আবার বিদ্যুৎ সংযোগ, রেশন কার্ড কিংবা বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেখা যায় রহস্যজনক নীরবতা।
এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন, যদি সরকার সত্যিই গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়, তাহলে কেন এখনও পর্যন্ত এই ধরনের অভিযোগের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না? কেন বারবার সরকারি প্রকল্পের নামে দালালরাজ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে? আর যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে একজন জনপ্রতিনিধির ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে পরিচিত ব্যক্তি কীভাবে প্রকাশ্যে এমন কাজ করার সাহস পেলেন? উল্লেখযোগ্যভাবে, নিরুপম নাথকে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত বলে দাবি বিভিন্ন মহলের।
কিছুদিন আগেই মুখ্যমন্ত্রীর কাছে কমলাক্ষকে মন্ত্রিত্ব দেওয়ার দাবিও তুলেছিলেন তিনি। ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে, এই অভিযোগের পর বিধায়ক নিজে কী অবস্থান নেন? তিনি কি প্রকাশ্যে তদন্তের দাবি তুলবেন? নাকি রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণেই বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যাবে? বিশ্বম্ভরপুরের অসহায় পরিবারটি বর্তমানে চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাঁদের কণ্ঠে একটাই প্রশ্ন, সরকার যদি বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেয়, তাহলে আমাদের টাকা দিতে হল কেন?
এখন দেখার, এই গুরুতর অভিযোগের পর প্রশাসন ও বিদ্যুৎ বিভাগ আদৌ কোনো তদন্তে নামে কিনা, নাকি অন্যান্য বহু অভিযোগের মতো এটিও সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে। তবে একথা স্পষ্ট, দরিদ্র মানুষের প্রাপ্য অধিকার নিয়ে যদি এভাবেই ছিনিমিনি খেলা চলতে থাকে, তাহলে সরকারের জনমুখী প্রকল্পগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই বড় প্রশ্নচিহ্ন উঠে যাবে।





