বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২১ অক্টোবরঃ আলো ঝলমলে আলোয় সাজানো শহর, ঢাকের বাদ্য আর আবালবৃদ্ধবণিতার কলকাকলিতে মুখরিত শারদোৎসবের আনন্দোচ্ছল প্রহর। ঠিক সেই আবহেই মহানবমীর উৎসবমুখর রাতে শিলচরের হৃদপিণ্ড বলে পরিচিত অম্বিকাপট্টি এলাকায় নেমে এল হিংসা ও নৈরাজ্যের ঘোর অন্ধকার। অহেতুক, অসংবেদনশীল ও আকস্মিকভাবে দুষ্কৃতী হামলার শিকার হলেন শহরের জ্যেষ্ঠ ও অত্যন্ত পরিচিত সাংবাদিক রাহুলকান্তি দেব। অভিযোগের তির অজয় রায় নামের এক ব্যক্তির দিকে, যিনি সম্পূর্ণ বিনা প্ররোচনায় ও অতি নির্মমভাবে প্রকাশ্য রাস্তায় চড়াও হন ওই সাংবাদিকের ওপর।
জনাকীর্ণ রাজপথে, স্থানীয় নবনির্বাচিত পুরপ্রতিনিধি ও গণমান্য ব্যক্তিবর্গের চোখের সামনে সংঘটিত এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি তৈরি হয়েছে সমগ্র কাছাড় জেলা জুড়ে। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের ওপর এমন দুঃসাহসিক ও মধ্যযুগীয় বর্বর আক্রমণের বিরুদ্ধে একসুরে ধিক্কার ও কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছে শিলচর প্রেস ক্লাব, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, আইনজীবী সমিতি এবং সচেতন বুদ্ধিজীবী মহল।

প্রাপ্ত তথ্য ও থানা সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার মহানবমীর রাতে যখন পুরো শিলচর শহর পুজো পরিক্রমায় মগ্ন, তখন সময় আনুমানিক রাত পৌনে এগারোটা। অম্বিকাপট্টির ব্যস্ত ফুটপাথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক রাহুলকান্তি দেব। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ২২ নম্বর ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত পুরপারিষদ, তাঁর স্বামী এবং এলাকার একাধিক বিশিষ্ট ও সম্মানিত নাগরিক। উৎসবে শান্তিশৃঙ্খলা ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করাই ছিল তাঁর চলাচলের প্রেক্ষাপট।
হঠাৎই কোনো রূপ সঙ্কেত বা বিবাদ ছাড়াই অম্বিকাপট্টির জনাকীর্ণ ফুটপাথে তাঁর ওপর চড়াও হয় অভিযুক্ত অজয় রায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনামানুসারে, কোনো কথা না বলেই অজয় রায় প্রচণ্ড হিংস্রতায় রাহুলবাবুর দিকে তেড়ে আসে এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে শারীরিকভাবে নিগ্রহ করা শুরু করে। তাঁকে শারীরিক আঘাত করার পাশাপাশি প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে আক্রমণ চালানো হয় বলে অভিযোগ।
উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত হয়ে যান এবং দ্রুত তাঁকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। এই বর্বর ঘটনায় সাংবাদিক রাহুলকান্তি দেব গুরুতর শারীরিক আঘাত পাওয়ার পাশাপাশি মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্থ হয়ে পড়েন। পরদিন, অর্থাৎ বুধবার সকালে সাংবাদিক রাহুলকান্তি দেব শিলচর সদর থানায় উপস্থিত হয়ে অভিযুক্ত অজয় রায়ের বিরুদ্ধে একটি বিস্তারিত লিখিত এজাহার দায়ের করেন। এজাহারে তিনি ঘটনার প্রতি মুহূর্তের বর্ণনা তুলে ধরে নিজের জীবন ও সুরক্ষার আশঙ্কার কথা জানান এবং অভিযুক্তকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করার দাবি জানান।
ঘটনার খবর চাউর হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে শিলচরের সাংবাদিক সমাজ। শিলচর প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই হামলার তীব্র প্রতিবাদ ও ধিক্কার জানানো হয়েছে। প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি বিকাশ চক্রবর্তী ও সাধারণ সম্পাদক শংকর দে এক যৌথ বিবৃতিতে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, শারদোৎসবের মতো একটি পবিত্র ও জনাকীর্ণ উৎসবে, শহরের প্রাণকেন্দ্র অম্বিকাপট্টিতে স্থানীয় পুরপারিষদ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের সামনে যদি একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের ওপর এভাবে প্রাণঘাতী হামলা চালানো হতে পারে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার হাল কী? এটি শুধু রাহুলকান্তি দেবের ওপর আক্রমণ নয়, এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকারের ওপর এক নগ্ন হামলা। আমরা প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট ভাষায় দাবি জানাচ্ছি, অভিযুক্ত অজয় রায়কে কালবিলম্ব না করে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। যদি পুলিশ প্রশ্রয় নীতি বা গাফিলতি দেখায়, তবে প্রেস ক্লাব সমস্ত নাগরিক সমাজকে সাথে নিয়ে রাজপথে ব্যাপক ও তীব্র আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর থেকেই শিলচরের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, প্রবীণ আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। শহরের প্রবীণ নাগরিকদের মতে, সম্প্রতি কাছাড় জেলায় দুষ্কৃতী ও সমাজবিরোধীদের বাড়বাড়ন্ত আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। এই ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা শহরের সচেতন নাগরিক ও বুদ্ধিজীবী মহলকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। শিলচরের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
উৎসবের রাতে পুলিশের এত নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি সত্ত্বেও কীভাবে শহরের কেন্দ্রস্থলে এমন গুণ্ডাগিরি সংঘটিত হলো? কতিপয় সুবিধাবাদী ও দুষ্কৃতী গোষ্ঠী সত্য প্রকাশে নির্ভীক সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে স্তব্ধ করতে চায়। এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। অপরাধী যতই প্রভাবশালী বা ক্ষমতাসীন হোক না কেন, তাকে যদি দ্রুগতিতে আইনের আওতায় না আনা হয়, তবে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হবে এবং সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি বিশ্বাস উঠে যাবে।
ঘটনার পর শিলচর সদর থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সাংবাদিক রাহুলকান্তি দেবের এজাহারের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ধারায় মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। অম্বিকাপট্টি ও পার্শ্ববর্তী এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি অভিযান শুরু হয়েছে। তবে সচেতন নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো স্রেফ আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে নারাজ। তাঁরা প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট ৩-দফা দাবি পেশ করেছেন, মূল অভিযুক্ত অজয় রায়কে অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে কঠোর ও জামিনঅযোগ্য ধারায় বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে হবে। রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো প্রকার প্রভাব ছাড়াই ঘটনার নিবিড় তদন্ত করে দ্রুত আদালতে চার্জশিট পেশ করতে হবে।
পেশাগত ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করার সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ প্রশাসনকে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। সাংবাদিকতা হলো সমাজের আয়না। সেই আয়না ভেঙে ফেলার বা সত্যের কণ্ঠরোধ করার এই বর্বর চেষ্টা সমগ্র শিলচর শহরের শান্তিকামী মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। অম্বিকাপট্টির এই হিংসাত্মক ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং অভিযুক্ত অজয় রায়ের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত শান্ত হবে না শিলচরের প্রেস ক্লাব ও সচেতন নাগরিক মহল। এখন দেখার, আসাম পুলিশ ও কাছাড় জেলা প্রশাসন কত দ্রুত এই অপরাধীকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।





