নিজ গড়ে সজল আচার্যের বধ, শিলচরে কংগ্রেসের ‘রাজনৈতিক সলিল সমাধি
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১০ অক্টোবরঃ কাছাড় জেলা কংগ্রেস সভাপতি সজল আচার্য এখন মুখ লুকাবেন কোথায়? নাকি আগের মতোই আবার বুক ফুলিয়ে দাবি করবেন নির্দলদের ভাঙিয়ে এনে পুরবোর্ড গঠন করে ফেলবেন? রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা কোন পর্যায়ে পৌঁছালে একটি ঐতিহ্যবাহী জাতীয় দল শহরের বুকে বিরোধী দলের ন্যূনতম যোগ্যতাটুকুও হারিয়ে ফেলে, সদ্যঘোষিত পুরনিগম নির্বাচনেই ফলাফল তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আজ শিলচরে বিজেপি বিরোধিতার আসল মুখ কংগ্রেস নয়, সেই জায়গায় শক্ত হাতে উঠে এসেছে নির্দল প্রার্থীরা। কাছাড়ের বিয়াল্লিশটি ওয়ার্ডের রাজনৈতিক মানচিত্রে কংগ্রেসের অস্তিত্ব আজ স্রেফ দূরবীক্ষণ যন্ত্রে খোঁজার শামিল!
সবচেয়ে বড় লজ্জার বিষয় হলো, যে সজল আচার্য বড় বড় ভাষণ দিয়ে দল পরিচালনা করছিলেন, তিনি নিজের ঘরটুকুই বাঁচাতে পারলেন না! তাঁর নিজ ওয়ার্ডেই চরম ও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন তাঁর স্ত্রী সঞ্চিতা আচার্য। এই পরাজয় শুধু সঞ্চিতা আচার্যের একার নয়, এটা সজল আচার্যের দাম্ভিকতা, ভুল নেতৃত্ব এবং স্বজনপোষণের রাজনীতির মুখে শিলচরের মানুষের এক বিরাট চপেটাঘাত! বিজেপির ঝড়ে যেখানে ৪২টি ওয়ার্ডের মধ্যে এককভাবে ৩০টি আসন শাসকদলের কবজায় এবং ২টি আসন জোটসঙ্গী এজিপির ঝুলিতে, সেখানে কংগ্রেসের হাতে এসেছে মাত্র ২টি আসন। বিপরীতে ৬টি ওয়ার্ড ছিনিয়ে নিয়ে শহরের দ্বিতীয় শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে নিজেদের জানান দিয়েছেন নির্দল প্রার্থীরা।
যে দল একসময় বরাক উপত্যকার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করত, তারা আজ নির্দলদের পেছনে ধুঁকছে এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে? পুরনিগম নির্বাচনে এবারে কংগ্রেসের টিকিট বণ্টন নিয়ে উঠেছে ভুড়ি ভুড়ি দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। ত্যাগী ও জনপ্রিয় কর্মীদের বঞ্চিত করে কার্যত টাকার বিনিময়ে টিকিট বিক্রির মতো গুরুতর অভিযোগের আবর্তে পড়েছিল পুরো কংগ্রেস নেতৃত্ব। দলীয় লোভী রাজনীতি, অহংকার আর স্বজনপোষণের সেই বিষবৃক্ষের ফলই আজ ব্যালট বাক্সে হাতেনাতে পেলেন সজল আচার্য আর জেলা কংগ্রেস।
যে দুটি ওয়ার্ডে কংগ্রেস কোনোক্রমে মুখ রক্ষা করেছে, তা-ও কি দলের আদর্শ বা সংগঠনের জোরে? একেবারেই নয়! ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে রাজর্ষি গোয়ালার জয় এসেছে তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত প্রভাব ও সামাজিক পরিচিতির ওপর ভর করে। আর ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে তীব্র নাটকীয়তা ও পুনর্গণনার ঝড় পেরিয়ে বিজয়ী সাক্ষী বণিকের ঝুলিতে আসনটি গেছে সজল বণিকের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে। অর্থাৎ, সজল আচার্যদের তথাকথিত দলীয় প্রতীকের কোনো ভূমিকা এখানে ছিল না; প্রার্থীরা জিতেছেন সম্পূর্ণ নিজেদের ব্যক্তিগত শক্তিতে।
শিলচরের সাধারণ মানুষ এবার ব্যালট বাক্সে কংগ্রেসকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ১, ১৯, ২৪, ২৫, ২৯ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে জয়ী নির্দল প্রার্থীরা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সংখ্যালঘু মেরুকরণের রাজনীতিতে জিতেননি, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটাররা সোচ্চার হয়ে বিজেপির বিকল্প হিসেবে নির্দল প্রার্থীদের বিশ্বাস করেছেন, কিন্তু চরম গণবিচ্ছিন্ন ও দুর্নীতিগ্রস্ত কংগ্রেসকে ভুলেও ছোঁননি।শহরের হাজারও সমস্যা রাস্তাঘাট, জলনিকাশি, কিংবা সাধারণ মানুষের কোনো আন্দোলনে বিগত দিনে কংগ্রেসের কোনো গঠনমূলক প্রতিবাদ বা শক্ত জনসমাবেশ চোখে পড়েনি। রাজনীতির মাঠ ছেড়ে কেবল এসি ঘরে বসে ব্যক্তিগত আক্রমণ আর টিকিট-বাণিজ্য নিয়ে মেতে থাকা সজল আচার্য গংরা আজ নিজ হাতেই দলের রাজনৈতিক ‘সলিল সমাধি’ ঘটিয়েছেন।
একটি রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক দল যখন নিজ জেলায় অস্তিত্ব হারিয়ে নির্দলদের পেছনে তলিয়ে যায় এবং খোদ জেলা সভাপতির স্ত্রী গো-হারা হারেন, তখন সেই দলের ভবিষ্যৎ অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নয়। এর পরও কি ‘কাঁচের ঘরে’ বসে থাকা এই ব্যর্থ নেতাদের চেতনা ফিরবে? নাকি নিজেদের হিংসা, লোভ, অহংকার আর দুর্নীতির আগুনে পুড়েই চিরতরে কাছাড়ের বুক থেকে মুছে যাবে কংগ্রেস? সময় এবং শিলচরের জনগণ কিন্তু স্পষ্ট রায় দিয়ে দিয়েছেন! এখন কি কংগ্রেসের আত্ম সমালোচনার সময় আসেনি? জেলা কংগ্রেসের তবোড় তাবর নেতারা কি এখনো ইগো নিয়ে বসে থাকবেন। যে তারা ঘরে বসবেন এসি রুমে আর ভোটাররা ঘরে এসে ভোট দিয়ে যাবেন।





