দলিল রেজিস্ট্রি থেকে শুরু করে নামজারীর ফাঁদে সর্বস্বান্ত হচ্ছিলেন সাধারণ মানুষ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩১ আগষ্টঃ ডাক্তারখানায় দালাল, হাসপাতালেও দালালের দৌরাত্ম্য এই চিরচেনা ছবির বাইরে গিয়ে এবার সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও শেষ সম্বল জমিজমা রেজিস্ট্রি করার পবিত্র মন্দিরটিকেও লুঠের আখড়ায় পরিণত করেছিল একটি অসাধু চক্র।
কাছাড় জেলার কাটিগড়া সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দিনের পর দিন ধরে চলা এই লাগামহীন দালালরাজ ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবশেষে বসল আইনি কোপ। শাসকদলীয় যুবমোর্চার সভাপতি সন্দীপ কুমার নাথ সহ দায়িত্বশীল মহলের সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে রবিবার সন্ধ্যায় কাটিগড়া থানার পুলিশ এক ঝটকায় গ্রেপ্তার করেছে এই চক্রের অন্যতম কুখ্যাত পাণ্ডা শাকিব আহমেদ বড়ভুঁইয়াকে।

এই চাঞ্চল্যকর গ্রেপ্তারের পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। তবে শুধু কি একজন মোহরার বা দালালকে খাঁচায় পুরলেই ঘুচবে এই দুর্নীতির কালো ছায়া? নাকি এই চক্রের শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত তা নিয়ে এখন কাটিগড়া জুড়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও জোরদার গুঞ্জন।
জমি কেনাবেচা থেকে শুরু করে বিবাহ নিবন্ধনে লুটের রাজত্ব চালাচ্ছিল এই সিন্ডিকেট চক্র
কাটিগড়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে জমি কেনাবেচা, দলিল লেখানো কিংবা পবিত্র বিবাহ নিবন্ধনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পরিষেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে বছরের পর বছর ধরে যে নরকযন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছিল, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি কোনো দাপ্তরিক অনুমোদন বা নিয়োগপত্র ছাড়াই দিনের পর দিন সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের ভেতরে দিব্যি নিজের আস্তানা গেড়ে বসেছিল শাকিব এবং তার শাগরেদরা।
ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিও ক্লিপে দেখা গেছে, দপ্তরে বিবাহ নিবন্ধন করতে আসা এক অসহায় ও নবদম্পতিকে সরকারি কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে স্বয়ং এক বেসরকারি যুবক তথা ভুঁইফোড় দালাল নিজেই দাঁড়িয়ে থেকে কায়দা করে শপথ বাক্য পাঠ করাচ্ছে! আর তার ঠিক পাশেই নিজ নিজ দাপ্তরিক চেয়ারে চুপচাপ বসে দায়িত্বশীল সরকারি কর্মীরা পালন করছেন নীরব ও কুলুপ আঁটা দর্শকের ভূমিকা।
এই ভিডিও সামনে আসতেই তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে সচেতন নাগরিক সমাজ। প্রশ্ন ওঠে, কোন জাদুবলে একজন বহিরাগত দালাল সরকারি কর্মীর চেয়ার ও ক্ষমতা দখল করে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করে? প্রশাসনিক নজরদারি তবে কি তবে পুরোপুরি শিকেয় উঠেছে কাটিগড়ায়?
ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে কাটিগড়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের চারিপাশ। অভিযোগ রয়েছে, রেজিস্টার্ড বিয়ে বা বিবাহ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ও নামমাত্র ফি নির্ধারিত থাকলেও, এই দালালচক্রের সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে প্রতিটি বিয়ে পিছু এক লাফে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ খাসাই করে নিত। দূরদূরান্ত থেকে কাজের ধান্দায় বা নানা প্রয়োজনে আসা সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করা, ভয় দেখানো এবং অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য করা ছিল এই চক্রের বাঁ হাতের খেল।
শুধু এক পাণ্ডাকে গ্রেপ্তার করলেই কি ঘুচবে দুর্নীতি, নাকি অন্তরালের রাঘববোয়ালদেরও মুখোশ খুলবে প্রশাসন?
একইভাবে জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রেও অনুমোদনহীন মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল এলাকাবাসী। দপ্তরের ভেতরে সরকারিভাবে অনুমোদিত মুহুরি বা দলিল লেখকদের পাশাপাশি একদল অনুমোদনহীন ও সাইনবোর্ডসর্বস্ব দালালের অবাধ বিচরণে সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারত না কে আসল আর কে নকল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভুলভাল ও ত্রুটিপূর্ণ দলিল তৈরি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো। আর পরবর্তী সময়ে সেই ভুলের খেসারত দিতে গিয়ে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরে নিঃস্ব হতেন সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতারা।
কাটিগড়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের এই অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির পাহাড় আর সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত জোরালো পদক্ষেপে নামে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব। শাসকদলীয় যুবমোর্চার সভাপতি সন্দীপ কুমার নাথ সহ বিশিষ্টজনদের সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এর ৬১, ১৩৬ এবং ৩০৮(২) ধারার অধীনে ৬৪/২০২৬ নম্বরে একটি গুরুতর ফৌজদারি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই মামলার ভিত্তিতেই রবিবার সন্ধ্যায় পুলিশ প্রধান অভিযুক্ত শাকিব আহমেদ বড়ভুঁইয়াকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
যদিও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্পষ্টভাবে নির্দেশিকা রয়েছে যে, সরকারি অনুমোদন বা বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়া কোনো বহিরাগত বা দালাল অফিস চত্বরে প্রবেশ করে দাপ্তরিক কাজে বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
কিন্তু বাস্তবে এই নির্দেশ কাগজেই বন্দি ছিল, কারণ অভিযোগের আঙুল উঠেছে দপ্তরেরই একাংশ দুর্নীতিগ্রস্ত মুহুরি ও অসাধু সরকারি কর্মচারীর গোপন যোগসাজশের দিকে। ভেতরে থাকা ঘুণপোকাদের মদত না পেলে একা কোনো বহিরাগত দালাল কীভাবে এভাবে দিনের পর দিন রাজত্ব কায়েম করতে পারে, তা নিয়ে এখন বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।
দালালচক্রের পাণ্ডা গ্রেপ্তারের খবর চাউর হতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন কাটিগড়ার সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীরা। তবে তাঁদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি শুধুমাত্র লোকদেখানো এক-দুটি গ্রেপ্তারিতে এই পচা সিস্টেমের রোগ সারবে না। কাটিগড়া সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়কে পুরোপুরি দালালমুক্ত করতে হবে এবং এর অন্তরালে লুকিয়ে থাকা রাঘববোয়ালদেরও মুখোশ খুলে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
অফিস চত্বরে অনুমোদিত মুহুরি ও দলিল লেখকদের নাম ও পরিচয় স্পষ্টভাবে ঝুলিয়ে দেওয়া, বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার চিরতরে নিষিদ্ধ করা এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জনবান্ধব পরিষেবা পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি এখন তুঙ্গে। সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরানো আয়ে ভাগ বসানো এই সিন্ডিকেটের বাকি কুশীলবরা কবে পুলিশের জালে ধরা পড়েন এবং প্রশাসন এই পচা ঘায়ে কীভাবে পাকাপাকিভাবে অস্ত্রোপচার করে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সমগ্র কাটিগড়াবাসী।






