ধলাইয়ের জগন্নাথপুরে স্বাধীনতার আট দশক পরও মৌলিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হাজারো মানুষ

উন্নয়নের রঙিন আলো তো দূরের কথা, ন্যূনতম মৌলিক নাগরিক পরিষেবাটুকুও আজও পৌঁছয়নি এই জনপদে। জীবনগ্রাম ও ভুবনডর জিপির দুটি বিচ্ছিন্ন টুকরো এলাকা নিয়ে গঠিত এই গ্রামের হাজারো মানুষের বেঁচে থাকাটা বর্তমানে এক মরণপণ লড়াই ছাড়া আর কিছুই নয়। শাসক দলের দম্ভভরা স্লোগান, বড় বড় ডিজিটাল হোডিং আর জনপ্রতিনিধিদের ফোপরা প্রতিশ্রুতির আড়ালে এখানে প্রতিদিন তিলে তিলে পিষে মরছে সাধারণ মানুষ।

গ্রামবাসীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই ক্ষোভ আজ আর ফিসফিসে অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা এক তীব্র আগ্নেয়গিরির রূপ নিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা বিশাল নাথ ও দিবাকর গোয়ালাদের চোখে-মুখে আজ কেবলই হতাশা, বঞ্চনা আর প্রতারণার গ্লানি। তাঁদের স্পষ্ট অভিযোগ, গত কয়েক দশক ধরে রাস্তা আর পানীয় জলের মতো জীবনমরণ সমস্যা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের বিধায়ক, মন্ত্রী থেকে শুরু করে সাংসদের দরজায় বছরের পর বছর মাথা কুটে মরেছেন তাঁরা।

নেতাদের মুখের মিষ্টি প্রতিশ্রুতি, উন্নয়নের রঙিন খোয়াব আর ভোটের বাক্সে মিথ্যে আশ্বাসের ফুলঝুরি ছাড়া বাস্তবে মেলেনি এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানীয় জল বা এক টুকরো পাকা পিচ রাস্তা। উন্নয়নের খাতা-কলমে জগন্নাথপুর হয়তো বারবার নানা সরকারি প্রকল্পের অংশ হিসেবে জায়গা পেয়েছে, কিন্তু মাঠের বাস্তব চিত্র বলছে, এই গ্রাম আজ সভ্য সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপ, যেখানে শাসক দলের উদাসীনতা এক অঘোষিত নির্বাসনের দশা তৈরি করেছে।

গ্রামের ভেতরে পা রাখলেই যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা যে কোনো বিবেকবান মানুষকে স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ করে দিতে বাধ্য। বর্ষাকাল আসমানে মেঘ জমলেই জগন্নাথপুরের বাসিন্দাদের বুক কাঁপতে শুরু করে। এই বর্ষার মরসুমে গ্রামের কাঁচা রাস্তায় চার চাকার গাড়ি তো দূরের কথা, একটি বাইক বা স্কুটি পর্যন্ত এগোতে পারে না। হাঁটুসমান আঠালো কাদা আর বেহাল খানাখন্দে ভরা রাস্তায় থমকে যায় গোটা জনজীবন। চরম ভোগান্তির শিকার হন কোমলমতি স্কুলপড়ুয়া থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।

তবে এই যন্ত্রণার সবচেয়ে অমানবিক ও বীভৎস রূপটি প্রকাশ পায় যখন গ্রামে কোনো গর্ভবতী মহিলা বা সংকটাপন্ন রোগী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এখানে অ্যাম্বুলেন্স আসার প্রশ্নই ওঠে না, কারণ গাড়ি ঢোকার রাস্তাটাই যে অস্তিত্বহীন! ফলে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও এখানকার মানুষকে নির্ভর করতে হয় বাঁশ ও কাপড়ের তৈরি আদিম যুগের ‘চেংড়া দোলা’ বা ডুলির ওপর।

রোগীকে সেই দোলায় চাপিয়ে কোমরজল, জঙ্গল ও কাদা পেরিয়ে গ্রামের বাইরে মূল সড়কে নিয়ে আসতে হয়। এরপর ভাগ্যকে সম্বল করে গাড়িতে তোলা হয় হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। স্বাধীনতার ৮০ বছর পর আজও প্রসূতি মৃত্যু বা পথেই রোগীর প্রাণহানির এই চরম আতঙ্ককে সঙ্গী করেই কাটছে জগন্নাথপুরবাসীর একেকটি দিন।

এই নরকযন্ত্রণার মাঝে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় পুনিখাল নদীর ওপরের সেই জরাজীর্ণ কালভার্টটি। আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে নির্মিত এই কালভার্টটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে চরম বিপজ্জনক ও মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। ভেঙে পড়া রেলিং, ফাটল ধরা দেওয়াল আর নড়বড়ে কাঠামোর ওপর দিয়ে প্রতিদিন জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে হয় সাধারণ মানুষকে।

বর্ষার দিনে এই কালভার্ট পার হওয়া মানে যেন স্বেচ্ছায় মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দেওয়া। অথচ বছরের পর বছর ধরে এই মরণফাঁদ সংস্কারের জন্য একাধিকবার স্থানীয় প্রশাসনের দুয়ারে দরবার করা হলেও আমলাতান্ত্রিক লালফিতের ফাঁদে আটকে থেকেছে ফাইল। জনগণের জীবন নিয়ে এই ছেলেখেলা আর কতদিন চলবে, সেই প্রশ্নই আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

জনপ্রতিনিধিদের এই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও পাথরসম উদাসীনতার বিরুদ্ধে ক্ষোভের পারদ চড়ছে ক্রমশ। স্থানীয়দের জোরালো অভিযোগ, প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বর্তমান দোর্দণ্ডপ্রতাপ সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য, এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক নিহার রঞ্জন দাস এবং বর্তমান বিধায়ক অমিয় কান্তি দাস সকলকেই জগন্নাথপুরের এই নরকীয় দুর্দশার কথা বহুবার সবিস্তারে জানানো হয়েছে।

কিন্তু ভোট চলে যাওয়ার পর মন্ত্রী-নেতারা আর এই ভাঙা রাস্তা বা গ্রামের ত্রিসীমায় ফিরেও তাকাননি। উন্নয়নের ঢাক পেটানো শাসক দলের নেতাদের এই প্রতিশ্রুতি কেবল ভোটের মরশুমের রাজনৈতিক স্টান্টবাজি ও মুখের মিষ্টি বুলির কারসাজি ছাড়া আর কিছুই নয়, তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।

প্রশাসনের এই লাগাতার নির্লিপ্ততা ও পরিহাসে অতিষ্ঠ হয়ে রবিবার শেষ পর্যন্ত নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতেই তুলে নিতে বাধ্য হন গ্রামের সাহসী যুবকেরা। কোনো নেতার কৃপা, মন্ত্রীর আশ্বাস কিংবা সরকারি অনুদানের দীর্ঘ অপেক্ষার ধার না ধেরে, এদিন স্থানীয় তরুণ ও বাসিন্দারা নিজেরাই কোদাল, শাবল ও ঝুড়ি হাতে নেমে পড়েন শ্রমদানে।

নিজেদের গাঁটের কড়ি খরচ করে এবং হাড়ভাঙা শারীরিক পরিশ্রমে গ্রামের প্রধান রাস্তার একটি অংশ কোনোমতে চলাচলের উপযোগী করে তোলার মরিয়া চেষ্টা চালান তাঁরা। দিবাকর গোয়ালা, বিশাল নাথ, দিলীপ রিকিয়াসন, দিগেন রায়, অশোক রায়, রূপক রায়, কৃষ্ণ নাথদের মতো সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বর্তমান সরকারের তথাকথিত ‘সবকা বিকাশ’ এর স্লোগান আসলে কতটা ফাঁকা আওয়াজ।

গ্রামবাসীদের পক্ষ থেকে এক কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, তাত্ক্ষণিকভাবে জগন্নাথপুরে একটি স্থায়ী পাকা সড়ক নির্মাণ করতে হবে, পুনিখাল নদীর ওপরের ঝুঁকিপূর্ণ কালভার্ট যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নতুন করে তৈরি বা সংস্কার করতে হবে এবং ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানীয় জলের সুব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে হবে।

আগামী দিনে যদি প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের টনক না নড়ে এবং এই মৌলিক দাবিগুলো দ্রুত পূরণ না হয়, তবে এই অবহেলিত জনপদের মানুষ আর হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। বৃহত্তর, তীব্রতর ও রক্তক্ষয়ী গণআন্দোলনের মাধ্যমে জাঁকজমকপূর্ণ উন্নয়নের সমস্ত প্রচারের মুখোশ চিরতরে খুলে দিতে বাধ্য হবে জগন্নাথপুরবাসী।

শাসক দলের মন্ত্রী-বিধায়কদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের আরামদায়ক জীবন আর সাধারণ মানুষের এই চরম নরকযন্ত্রণা এই দুয়ের মধ্যকার আকাশ-পাতাল ফারাকই আজ রাজ্যের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার নৈতিকতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

Related Posts

এভারেস্টের মশলায় এফএসএসএআই এর লাল সংকেত!

ভুল লেবেলিং ও নিম্নমানের অভিযোগে নোটিস, এগকারি, চিকেন ও গরম মশলাও তদন্তের আওতায়, জবাব তলব খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩১ আগষ্টঃ রান্নাঘরের চাবিকাঠি কি আজ স্লো-পয়সনিংয়ের লাইসেন্স হয়ে উঠছে?…

 সাধারণ মানুষের হাজারের কিস্তিতে মান-সম্মান সাফ, আর ২২ হাজার কোটি লোনে মাফ!

আমজনতার ইএমআই মিস হলেই এজেন্টের তাগাদা ও সিবিল স্কোরে কোপ, ঋণব্যবস্থার দ্বিমুখী নীতি ঘিরে উঠছে প্রশ্ন বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩১ আগষ্টঃ মাসান্তে ইএমআই এর কিস্তি মেটাতে না পেরে যখন সাধারণ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *