বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ আইনশৃঙ্খলাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বরাক উপত্যকায় একের পর এক নাশকতামূলক ও ধ্বংসাত্মক ঘটনা বেড়েই চলেছে। কাছাড় জেলার সোনাই থানার অন্তর্গত বেরাবাক দ্বিতীয় খণ্ড, ভকরারপার এলাকায় গভীর রাতে এক অসহায় গরিব চালকের ই-রিকশায় ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনায় গোটা অঞ্চলে তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিদিনের পরিশ্রমের সম্বল একমাত্র উপার্জনের মাধ্যমটিকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার এই কাপুরুষোচিত কান্ড কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয়; এটি এক সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের ওপর সরাসরি চরম আঘাত। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, গত সোমবার গভীর রাতে যখন গোটা ভকরারপার এলাকা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই ঘড়ির কাঁটায় আনুমানিক পৌনে দু’টো।
প্রতিদিনের মতো সারাদিনের ক্লান্তিকর পরিশ্রম শেষে নিজের বসতবাড়ির সামনেই AS 11G C 3017 নম্বরের ই-রিকশাটি পার্ক করে পরিবারের সঙ্গে ঘুমাচ্ছিলেন চালক জিয়াউল হুসেন লস্কর। কিন্তু মাঝরাতে হঠাৎ ই-রিকশা থেকে ছড়ানো তীব্র গন্ধ এবং আলোর রোশনাইয়ে ঘুম ভাঙে তাঁর স্ত্রীর। ঘরের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়েই তাঁর বুক কেঁপে ওঠে চোখের পলকে দাউদাউ করে জ্বলছে তাঁদের পরিবারের একমাত্র আয়ের সম্বল ই-রিকশাটি।
স্ত্রীর প্রাণপণ চিৎকার ও আর্তনাদে মুহূর্তের মধ্যে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসেন জিয়াউল ও তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। প্রাণপণে জল ঢেলে আগুন নেভানোর মরিয়া চেষ্টা চালান তাঁরা। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। আগুনের লেলিহান শিখা এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই সম্পূর্ণ ই-রিকশাটি পুড়ে ছাই হয়ে লোহালক্করে পরিণত হয়।
তবে ভাগ্যিস আশপাশে আরও কিছু বড় বিপর্যয় ঘটেনি; কারণ ঠিক পাশেই অন্য এক প্রতিবেশীর একটি অটোরিকশা রাখা থাকলেও স্থানীয়দের তৎপরতা ও দ্রুত পদক্ষেপে সেটিকে অক্ষত অবস্থায় রক্ষা করা সম্ভব হয়। নতুবা বড় কোনো অগ্নিকাণ্ডে গোটা পাড়াই ভস্মীভূত হয়ে যেতে পারত। এই ঘটনার নেপথ্যে যে সম্পূর্ণ পরিকল্পিত এবং সুদূরপ্রসারী কোনো নাশকতার হাত রয়েছে, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই ভুক্তভোগী পরিবারটির।
অভিযোগের আঙুল তুলে জিয়াউল হুসেন জানিয়েছেন, যখন তিনি ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসেন, ঠিক সেই সময় দুই অপরিচিত যুবককে তাঁর বাড়ির প্রাঙ্গণ থেকে দ্রুত দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখেন তিনি। তাঁর স্পষ্ট ধারণা, ওই দুই যুবক কিংবা স্থানীয় কোনো কুচক্রী মহল প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাতের অন্ধকারে পেট্রল বা দাহ্য পদার্থ ঢেলে এই নারকীয় কাণ্ড ঘটিয়েছে।
গরিব মানুষের পেটে লাথি মারার এমন ঘৃণ্য মানসিকতা দেখে হতবাক পাড়ার সাধারণ মানুষও। কীভাবে একটি পরিবারের একমাত্র অন্নসংস্থানের পথকে নিমেষে ধ্বংস করে দেওয়া হলো, তা নিয়ে এখন চলছে তীব্র সমালোচনা। প্রশ্ন উঠছে, সোনাইয়ের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাতের অন্ধকারে অপরাধীরা কীভাবে এই স্পর্ধা দেখায়? পুলিশি টহলদারি ও নজরদারি কি তবে কেবল কাগজ কলমেই সীমাবদ্ধ?
ঘটনার পরই রাতেই খবর পেয়ে দ্রুত সোনাই থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। পুড়ে যাওয়া ই-রিকশার কঙ্কালটি পরিদর্শন করার পাশাপাশি পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে। এই ঘটনার পরদিন অর্থাৎ মঙ্গলবার ক্ষতিগ্রস্ত ই-রিকশা চালক জিয়াউল হুসেন লস্কর নিজে বাদী হয়ে সোনাই থানায় অজ্ঞাত দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করেছেন। ঠিক কোন আক্রোশ থেকে বা কারা এই ধ্বংসাত্মক কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তা উদঘাটনে এখন জোর তল্লাশি চালাচ্ছে সোনাই থানার পুলিশ।
তবে কেবল একটি মামলা দায়ের বা দায়সারা তদন্ত দিয়ে যে এই গভীর সংকটের সুরাহা হবে না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। অবিলম্বে অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুত কঠোর গ্রেপ্তার না করা হলে, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করবে এবং এই ধরনের দুষ্কৃতীরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠবে। সোনাইয়ের মাটিতে এই ধরনের অসামাজিক শক্তির দৌরাত্ম্য রুখতে পুলিশ প্রশাসনের আরও কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপের দাবি সচেতন নাগরিকদের ।






