বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২২ আগষ্টঃ সীমান্তবর্তী জেলা কাছাড়ের হৃদপিণ্ড শিলচর শহরে আবারও মাদকের এক বিশাল সাম্রাজ্যের পর্দাফাঁস করল পুলিশ। তবে এই সাফল্যের পেছনে যেমন উঠে এসেছে আইনশৃঙ্খলার তৎপরতার কথা, তেমনই আরও একবার নগ্ন হয়ে পড়েছে শহরের অলিগলিতে কীভাবে নিঃশব্দে শিকড় ছড়াচ্ছে মারণ মাদকের নেটওয়ার্ক। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে কাছাড় জেলা পুলিশ শিলচর থানার অন্তর্গত দক্ষিণ কৃষ্ণপুর গ্রামের রহিমের দোকান এলাকা থেকে বাজেয়াপ্ত করেছে প্রায় ৭০ হাজার সন্দেহজনক ইয়াবা ট্যাবলেট, যার আনুমানিক ওজন ৭.৬ কেজি। ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে দুই ভাই তথা মূল অভিযুক্তকে।
একদিকে পুলিশের এই সাফল্য সাময়িক স্বস্তি দিলেও, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে, কীভাবে ঘনবসতিপূর্ণ একটি আবাসিক এলাকায় ভাড়া ঘর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এত বড় মাদকের আস্তানা চালানো সম্ভব হচ্ছিল? পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দক্ষিণ কৃষ্ণপুর এলাকার ‘রহিমের দোকান’ সংলগ্ন একটি ভাড়া ঘরকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরেই সন্দেহজনক আনাগোনা নজর এড়ায়নি স্থানীয়দের। তবে বৃহস্পতিবার রাতে গোপন সূত্রের নির্দিষ্ট খবরের ভিত্তিতে শিলচর থানার পুলিশ সেখানে এক ঝটিকা তল্লাশি অভিযান চালায়।
অভিযান পরিচালনকারী দলের সদস্যরা ঘরটিতে প্রবেশ করে ব্যাপক তল্লাশি চালান। তল্লাশিতে ঘরটির ভেতর থেকে নীল ও কালো রঙের মোট ৭টি বিশেষ প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। প্যাকেটগুলি খুলতেই চক্ষু চড়কগাছ কর্মকর্তাদের! ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সারি সারি লাল ও গোলাপী রঙের সন্দেহজনক ইয়াবা ট্যাবলেট। পুলিশি হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া মোট ট্যাবলেটের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার, যার মোট গ্রস ওজন ৭.৬ কেজি। আন্তর্জাতিক বাজারে যার আনুমানিক মূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে মনে করা হচ্ছে।
ঘটনাস্থল থেকেই পুলিশ দুই অভিযুক্তকে হাতেনাতে আটক করে, পরবর্তীতে তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করা হয়। ধৃতরা হলেন, আজমল উদ্দিন লস্কর (৪৭), পিতা, প্রয়াত বদর উদ্দিন লস্কর। আজিম উদ্দিন লস্কর (২৮), পিতা, প্রয়াত বদর উদ্দিন লস্কর। বিস্ময়কর বিষয় হলো, ধৃত দুজনেরই মূল বাড়ি কাছাড় জেলার শিলচর থানারই অন্তর্গত সৈদপুর পার্ট-১ এলাকায়। নিজের গ্রাম ছেড়ে শহরের উপকণ্ঠে এসে এমনভাবে ঘর ভাড়া নিয়ে মাদকের কারবার চালানোর পেছনে কেবল স্থানীয় খুচরা ব্যবসা নয়, বরং কোনো আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাজ্য ড্রাগ পাচার চক্রের যোগসূত্র রয়েছে বলে জোর অনুমান করা হচ্ছে।
ইয়াবা ট্যাবলেট, যা মূলত মেথঅ্যাম্ফিটামিন ও ক্যাফেইনের একটি মারাত্মক মিশ্রণ, বর্তমানে উত্তর-পূর্ব ভারতের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে মনিপুর ও মিজোরাম সীমান্ত হয়ে এসব ট্যাবলেট আসামে প্রবেশ করে। শিলচরের দক্ষিণ কৃষ্ণপুরের মতো এলাকাকে আস্তানা হিসেবে বেছে নেয়। ভাড়াটিয়াদের তথ্য থানা বা স্থানীয় পঞ্চায়েতে জমা দেওয়ার সরকারি নিয়ম থাকা সত্ত্বেও, কীভাবে অপরাধীরা দিনের পর দিন এত বিপুল পরিমাণ মাদক জমিয়ে রাখার সাহস পায়? গৃহকর্তা ও স্থানীয় প্রতিবেশীদের উদাসীনতা নাকি ভয়, কোন সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছিল এই পাচারকারীরা, তা এখন বড় প্রশ্ন।
ঘটনায় ধৃতদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন এর একাধিক কঠোর ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ট্যাবলেটের রাসায়নিক পরীক্ষা এবং এর মূল উৎসের সন্ধান পেতে তদন্ত শুরু করেছে কাছাড় পুলিশ। কাছাড়ের পুলিশ প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, উদ্ধার হওয়া মাদকের উৎস এবং এটি বরাক উপত্যকার স্থানীয় বাজারে ছড়ানোর পরিকল্পনা ছিল নাকি অন্য কোথাও পাচারের উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল, তা ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাদকবিরোধী অভিযান আগামী দিনে আরও তীব্র করা হবে।






