বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৬ আগষ্টঃ দোকান, শপিং মল কিংবা রেস্তোরাঁয় গিয়ে ২,০০০ টাকার বেশি ইউপিআই পেমেন্ট করলে কি অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে? গত কয়েকদিন ধরে এই প্রশ্ন ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ইউপিআইয়ের মাধ্যমে বড় অঙ্কের লেনদেন করলেই হয়তো বাড়তি চার্জ কেটে নেওয়া হবে।
তবে বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন।বর্তমানে সাধারণ গ্রাহকদের ইউপিআই পেমেন্টে কোনও অতিরিক্ত চার্জ দিতে হচ্ছে না এবং সরকার এখনও এমন কোনও নিয়ম কার্যকর করেনি। তবে ভবিষ্যতে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও টেকসই করতে কেন্দ্র সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সংসদে পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট সংশোধনের একটি বিল উত্থাপন করেছেন। এই সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সরকার ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কিছু বাণিজ্যিক ইউপিআই লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট চালু করার আইনি ক্ষমতা পাবে। যদিও এই বিল পাস হয়ে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে কোনও চার্জ কার্যকর হবে না। এর জন্য সরকারের পৃথক বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে।
মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর হল ডিজিটাল পেমেন্ট প্রক্রিয়াকরণের জন্য ব্যাংক, পেমেন্ট গেটওয়ে বা ডিজিটাল পেমেন্ট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলিকে দেওয়া পরিষেবা-শুল্ক। বর্তমানে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের এই চার্জ বহন করতে হয়। কিন্তু ইউপিআই চালুর পর থেকে সরকার ‘জিরো এমডিআর’ নীতি অনুসরণ করেছে, ফলে ইউপিআই লেনদেনে কোনও পরিষেবা-শুল্ক নেওয়া হয় না।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, আলোচনাধীন প্রস্তাব অনুযায়ী বছরে দেড় কোটি টাকার বেশি ব্যবসা করে এমন বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, শপিং মল এবং বড় রেস্তোরাঁগুলির ক্ষেত্রে এই নিয়ম চালু হতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২,০০০ টাকার বেশি মূল্যের ইউপিআই লেনদেনে ০.৩ শতাংশ থেকে ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত এমডিআর ধার্য করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অর্থ সাধারণ গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কাটা হবে না। বরং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকেই ব্যাংক বা ডিজিটাল পেমেন্ট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাকে এই চার্জ দিতে হবে। অর্থাৎ দোকান থেকে কেনাকাটা করে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে টাকা দিলেই গ্রাহকের উপর সরাসরি কোনও অতিরিক্ত বোঝা চাপছে না।
অন্যদিকে, একজন ব্যক্তি থেকে আরেকজন ব্যক্তির কাছে টাকা পাঠানো—যেমন বন্ধু বা আত্মীয়কে অর্থ পাঠানো, বাড়িভাড়া দেওয়া, ব্যক্তিগত লেনদেন কিংবা ছোটখাটো অনলাইন পেমেন্ট আগের মতোই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকবে বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। ইউপিআই পরিষেবা পরিচালনা, সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রতারণা রোধ এবং প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো বজায় রাখতে ফিনটেক সংস্থাগুলিকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।
কিন্তু ইউপিআই লেনদেনে কোনও পরিষেবা-শুল্ক না থাকায় দীর্ঘমেয়াদে এই পরিষেবাকে লাভজনক ও টেকসই করে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই কারণেই নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এমডিআর চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
ভারতে ডিজিটাল লেনদেনের জনপ্রিয়তা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই রেকর্ড ২,৩৬০ কোটি ইউপিআই লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, যার মোট আনুমানিক আর্থিক মূল্য প্রায় ২৯.৯ লক্ষ কোটি টাকা। এই বিপুল লেনদেন সামলাতে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষক সংস্থা জেফারিজ-এর মতে, যদি ২,০০০ টাকার বেশি ইউপিআই লেনদেনে এমডিআর চালু হয়, তাহলে ফোনপে, গুগল পে, পেটিএম এবং পাইন ল্যাবস এর মতো ডিজিটাল পেমেন্ট সংস্থাগুলি বছরে অতিরিক্ত ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব আয় করতে পারে। এতে ডিজিটাল পেমেন্ট পরিকাঠামোয় আরও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে বলেও মনে করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে সাধারণ গ্রাহক কিংবা পাড়ার ছোট দোকানদারদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই। সংসদে উত্থাপিত সংশোধনী বিলটি মূলত ভবিষ্যতের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ। সরকার আলাদা করে কোনও সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি না করা পর্যন্ত ইউপিআইয়ের বর্তমান ‘জিরো এমডিআর’ নীতিতেই লেনদেন চলবে।
সব মিলিয়ে, আপাতত ইউপিআই ব্যবহারকারীদের জন্য স্বস্তির খবরই রয়েছে। তবে ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে নতুন নীতি কার্যকর হতে পারে। সেই কারণে সংসদে উত্থাপিত এই বিল এবং সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই এখন নজর রাখছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং ডিজিটাল পেমেন্ট পরিষেবা সংশ্লিষ্ট মহল।






