৫ বছরে শুধু প্রিন্ট বিজ্ঞাপনেই ৯১০ কোটি টাকা! সরকারি বিজ্ঞাপনে শীর্ষে টাইমস অব ইন্ডিয়া

এই তথ্য সামনে আসতেই সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনের ধরণ, সংবাদমাধ্যমভিত্তিক বরাদ্দ এবং জনস্বার্থে সরকারি প্রচারের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনা শুরু হয়েছে। লোকসভায় কংগ্রেস সাংসদ রাধাকৃষ্ণের এক লিখিত প্রশ্নের উত্তরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক জানায়, গত পাঁচ অর্থবর্ষে সরকারি প্রিন্ট বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রথম স্থান ধরে রেখেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। শুধু একটি বছরে নয়, ২০২০-২১, ২০২১-২২, ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ প্রতিটি অর্থবর্ষেই সরকারি বিজ্ঞাপন প্রাপ্তির নিরিখে এই সংবাদপত্রই ছিল শীর্ষে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে দৈনিক জাগরণ, যার প্রাপ্ত সরকারি বিজ্ঞাপনের মূল্য ৫৯.১৪ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে থাকা হিন্দুস্তান টাইমস পেয়েছে ৪৭.৮০ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে অমর উজালা (২৪.৯২ কোটি টাকা), হিন্দুস্তান (২১.৫৬ কোটি টাকা), দৈনিক ভাস্কর (২০.৫৩ কোটি টাকা) এবং দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, যার প্রাপ্ত বিজ্ঞাপনের মূল্য ৬.৫১ কোটি টাকা।

প্রকাশিত পরিসংখ্যান আরও দেখাচ্ছে, মোট ৯১০.৪০ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন ব্যয় বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্রের মধ্যে বণ্টন করা হলেও বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বৈষম্য রয়েছে। কয়েকটি বড় সংবাদপত্র কয়েক দশকোটি টাকার বিজ্ঞাপন পেলেও বহু সংবাদপত্র তুলনামূলকভাবে অনেক কম বরাদ্দ পেয়েছে। ফলে সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনের নীতি ও অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

তবে এই পাঁচ বছরের হিসাবই পুরো চিত্র নয়। লোকসভায় প্রকাশিত একই উত্তরে আরও জানানো হয়েছে, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ এই মোট ১১টি অর্থবর্ষে কেন্দ্র সরকার প্রিন্ট, টেলিভিশন, ডিজিটাল এবং অন্যান্য মাধ্যমে সরকারি বিজ্ঞাপন প্রকাশে মোট ৫,৯৮৭.৪৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।

এই বিপুল অঙ্ককে সময়ের হিসেবে ভাগ করলে দেখা যায়, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কেন্দ্র সরকার গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১.৫ কোটি টাকা সরকারি বিজ্ঞাপনে ব্যয় করেছে। সরকারি প্রকল্প, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি, স্বাস্থ্য সচেতনতা, শিক্ষা, কৃষি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক প্রচারের জন্য এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে বলে মন্ত্রক জানিয়েছে।

বছরভিত্তিক ব্যয়ের দিক থেকেও কিছু তথ্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে বিজ্ঞাপন খাতে মোট ব্যয় ছিল ৩৫৩.৯৮ কোটি টাকা, যা সংশ্লিষ্ট সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ ব্যয়। পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সেই ব্যয় কিছুটা কমে ৩২৩.৪১ কোটি টাকা হলেও তা এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

এই সময়কালটি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ও পরে হওয়ায় বিজ্ঞাপন ব্যয়ের এই প্রবণতা রাজনৈতিক মহলেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, সরকারি বিজ্ঞাপনের একটি অংশ শাসক দলের ভাবমূর্তি তুলে ধরার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। যদিও কেন্দ্র সরকার এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের বক্তব্য, সরকারি বিজ্ঞাপনের একমাত্র উদ্দেশ্য হল বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প, নীতি, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং জনসচেতনতামূলক বার্তা দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সরকারের দাবি, বিজ্ঞাপন প্রকাশ সম্পূর্ণভাবে জনস্বার্থে এবং প্রশাসনিক তথ্য নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে করা হয়। তবে সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশের পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, সরকারি বিজ্ঞাপন শুধুমাত্র তথ্য প্রচারের মাধ্যম নয়, এটি এখন বিপুল আর্থিক ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রও।

কোন সংবাদপত্র কতটা সরকারি বিজ্ঞাপন পাচ্ছে, কী ভিত্তিতে সেই বরাদ্দ হচ্ছে এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কতটা স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে, এসব প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। লোকসভায় প্রকাশিত এই পরিসংখ্যান তাই শুধু ব্যয়ের হিসাব নয়, সরকারি বিজ্ঞাপন নীতি, সংবাদমাধ্যমের অর্থনীতি এবং জনসম্পদের ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে ভবিষ্যতের আলোচনারও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

Related Posts

‘পড়বে ভারত, এগোবে ভারত’ কেবল বিজ্ঞাপনেই, সরকারি শিক্ষার করুণ দশায় পিষে যাচ্ছে গরিবের সন্তান

একজন শিক্ষকের ঘাড়ে আস্ত স্কুলের বোঝা চাপিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৬ আগষ্টঃ  “পড়বে ভারত, তবেই এগোবে ভারত” এই স্লোগান বহু…

১২ বছরে ১৭ কোটিরও বেশি কর্মসংস্থান!

বেকারত্ব নেমেছে ৩.১ শতাংশে,  জেন জি-র ক্ষোভের মাঝেই কর্মসংস্থানের রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ মোদী সরকারের বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৬ আগষ্টঃ দেশে বেকারত্ব, চাকরির সংকট এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিয়ে যখন রাজনৈতিক বিতর্ক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *