শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ডে ক্রমাগত কুঠারাঘাত, দুর্নীতি ও ডিজিটাল কারসাজিতে ধসে পড়ছে শিক্ষার ভবিষ্যৎ!

বরং এটি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়া এক মারাত্মক ব্যাধির সাম্প্রতিকতম উপসর্গ মাত্র! মেধাবী শিক্ষার্থীদের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম যখন হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের মাধ্যমে কয়েক হাজার টাকায় বিকিয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি তবে এমন এক ব্যবস্থার দিকে হাঁটছি যেখানে যোগ্যতার স্থান দখল করছে কেবল আর্থিক লেনদেন আর অসৎ উপায়?

বিগত কয়েক বছরে সর্বভারতীয় পরীক্ষা থেকে শুরু করে রাজ্য স্তরের রিক্রুটমেন্ট পরীক্ষা কোথাও প্রশ্নফাঁস চক্রের হাত থেকে রেহাই মেলেনি। একের পর এক মেগা কেলেঙ্কারি স্তম্ভিত করে দিয়েছে গোটা দেশকে, সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট-ইউজি)-য় প্রশ্নপত্র ফাঁস, নির্দিষ্ট কেন্দ্রে অস্বাভাবিক নম্বরের জোয়ার এবং কোটি টাকার গোপন লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসে।

এর রেশ কাটতে না কাটতেই ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) পরিচালিত ইউজিসি-এনইটিপরীক্ষার প্রশ্নপত্র ‘ডার্কনেটে’ ফাঁস হওয়ায় পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক। দেশের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থার এই ব্যর্থতা লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত আঁধারে ঠেলে দেয়।

বিহার লোকসেবা আয়োগের (বিপিএসসি) ৬৭তম প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরীক্ষা শুরুর মিনিট কয়েকের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, যার জেরে বাতিল করতে হয় মেগা পরীক্ষাটি। একইভাবে রাজস্থান (আরইইটি), মধ্যপ্রদেশ (পটাওয়ারি পরীক্ষা) এবং উত্তরপ্রদেশে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস রীতিমতো এক জাতীয় মহামারীর আকার ধারণ করেছিল।

পরীক্ষার হলে বসে নীল কালির কলমে যখন শত শত ছাত্রছাত্রী উত্তর লিখছিলেন, তখন হয়তো তাঁরা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে তাঁদের সমস্ত পরিশ্রম ও ভবিষ্যৎ ইতিমধ্যেই স্থান পেয়েছে কোনো ডিজিটাল দুর্নীতির শিকার হয়ে! ছত্তিশগড়ের মর্যাদাপূর্ণ ইন্দিরা গান্ধী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি কৃষি বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিস্টার পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চরম কেলেঙ্কারির জেরে বাতিল ঘোষণা করা হলো।

হোয়াটসঅ্যাপের স্ক্রিনে ঘুরে বেড়ানো এক প্রশ্নপত্রের সঙ্গে পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রায় ৭০ শতাংশ হুবহু মিলে যাওয়ায় তোলপাড় গোটা রাজ্য। শিক্ষা প্রশাসনের এই নজিরবিহীন অদক্ষতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতায় আবারও ব্যাকফুটে ছত্তিশগড়ের শিক্ষা ব্যবস্থা।

ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার সকালে। রায়পুরের ইন্দিরা গান্ধী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা ছত্তিশগড়ের মোট ৩৪টি কলেজে আয়োজিত হয়েছিল দ্বিতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের পরীক্ষা। বিষয় ফসল ও সংরক্ষিত শস্যের কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ–১ (রবি শস্য)। দুপুর ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত চলা এই পরীক্ষায় প্রায় ৫০০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এক বিস্ফোরক খবর।

অভিযোগ ওঠে, পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই হোয়াটসঅ্যাপের বিভিন্ন গ্রুপে ঘুরছিল একটি প্রশ্নপত্র, যার সঙ্গে হলে দেওয়া আসল প্রশ্নপত্রের ৭০ শতাংশেরও বেশি হুবহু এক! ঘটনা জানাজানি হতেই মুহূর্তের মধ্যে ছাত্রসমাজের ক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।

খবরটি প্রকাশ্যে আসতেই রায়পুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুপুরের পর বিরোধী কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ‘ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’ র কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের সামনে প্রশাসনিক গাফিলতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখান। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ময়দানে নামে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ ।

দুই ছাত্র সংগঠনের দফায় দফায় প্রতিবাদ ও স্লোগানবাজিতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে প্রশাসনিক কার্যালয়। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে তড়িঘড়ি পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক তদন্তে গড়মিল স্পষ্ট হতেই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা বিভাগের পরিচালক তথা পরীক্ষা নিয়ামক একটি সরকারি নির্দেশিকা জারি করে পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ বাতিলের কথা ঘোষণা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. কপিল দেব দীপক সংবাদ মাধ্যমকে জানান, আমরা সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সন্ধ্যায় পরীক্ষাটি বাতিল করেছি। প্রশ্নপত্র অভ্যন্তরীণভাবে বা কোনো গোপন সূত্রের মাধ্যমে আগেভাগে ফাঁস হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট করতে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সংক্রান্ত গোপনীয়তা কতটা ভঙ্গুর হলে মূল প্রশ্নপত্রের ৭০ শতাংশ হুবহু সামাজিক মাধ্যমে বিকিয়ে যায়? বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সিকিউরিটি প্রোটোকল ও নজরদারি ব্যবস্থা কি স্রেফ খাতায়-কলমেই সীমাবদ্ধ?

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখন নিজেদের দায় এড়াতে রায়পুরের তেলিবাঁধা থানায় অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। পুলিশ তদন্ত করবে ঠিকই, কিন্তু যে শিক্ষার্থীরা রাতের পর রাত জেগে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, এই মানসিক হয়রানির দায় কে নেবে? বর্তমানে স্থগিত হওয়া এই পরীক্ষাটি আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পুনরায় নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

তবে নির্দিষ্ট তারিখ এখনও ঘোষণা না করায় ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের। প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই চক্রের আসল কারিগর কারা, তা পুলিশি তদন্তে বের হয় নাকি এটিও ফাইল বন্দি প্রশাসনিক ব্যর্থতার আর একটি নিদর্শন হয়ে থাকে, এখন সেটাই দেখার!

Related Posts

শিলচর পুরনিগম নির্বাচন: ডিগ্রিতে জালিয়াতি করলেই কপালে শনি, জাল সার্টিফিকেট জমা দিলেই শ্রীঘরে যাওয়ার রাস্তা পাকা!

ভুঁইফোড় বোর্ডের সার্টিফিকেট দিয়ে আর পার পাওয়া যাবে না, মেধা ও সততার অগ্নিপরীক্ষায় নামতে হচ্ছে প্রার্থীদের, শিলচর পুরনিগম নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিলের কড়া হুঁশিয়ারি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩ সেপ্টেম্বরঃ বরাক উপত্যকার…

শিলচরে ব্যবসার নামে লোভনীয় লভ্যাংশের ফাঁদ পেতে প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ, শিলচরের বেরেঙ্গার সাদ্দামের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।

গ্রেপ্তারির পর জামিনে বেরিয়ে সামাজিক বিচারসভার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ; ২৫ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই উধাও প্রতারক। বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ বরাক উপত্যকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র শিলচরে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *