নিম্নমানের কাজের অভিযোগে কুড়িটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগের লাইফলাইন নিয়ে বাড়ছে আতঙ্ক
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ আগষ্টঃ চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে সরকারি অর্থের অপচয়, নিম্নমানের কাজ এবং প্রশাসনের চরম উদাসীনতার এক ভয়ঙ্কর ও নগ্ন চিত্র অবশেষে প্রকাশ্যে এল। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, দীর্ঘমেয়াদি দাবি এবং বহু আন্দোলনের পর রামকৃষ্ণনগর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত মাগুরাঘাটে সিংলা নদীর উপর নির্মিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাকা সেতুটিতে কদিনের মধ্যেই ফাটল দেখা দেওয়ায় এখন থেকেই চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। মাগুরাছড়া, পশ্চিম পাঠাখাউরী, সিমসিমপুরসহ প্রায় ২০টি গ্রামের সাধারণ মানুষের যাতায়াতের একমাত্র এই লাইফলাইনটিতে আজ ফাটল দেখা দেওয়ায় মানুষের জীবন ও জীবিকা ফের বড় সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
সিংলা নদীর উপর এই সেতুটি নির্মাণের ফলে একসময়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটাই সহজ হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি ও আশার আলো দীর্ঘস্থায়ী হলো না। নির্মাণের কালি শুকাতে না শুকাতেই যেভাবে সেতুর মূল কাঠামোর বিভিন্ন অংশে ফাটল ধরতে শুরু করেছে, তাতে জনমনে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানিয়েছেন, এটি কেবল সাধারণ কোনো ফাটল নয়, এটি সরকারি তহবিলের লুটপাট এবং নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
শুধু সেতুটিই নয়, সেতুর সংযোগকারী (অ্যাপ্রোচ) সদ্য নির্মিত দুটি গ্রামীণ সড়কেও বিভিন্ন স্থানে ধস ও ফাটল দেখা দিয়েছে। যে সড়ক এবং সেতু দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন, তার এই বেহাল দশা প্রমাণ করে দেয় যে কাজের মান নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও নজরদারি দপ্তরে ব্যাপক গাফিলতি ছিল। একটি নতুন পরিকাঠামো দাঁড়িয়ে থাকার কথা যেখানে দীর্ঘ বছর, সেখানে সামান্য কয়েকদিনের ব্যবধানে তাতে ফাটল ধরার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
গ্রামবাসীদের গভীর আশঙ্কা, এই পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং কঠোর মেরামতের ব্যবস্থা না করা হলে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সেতুটি যদি সম্পূর্ণ বসে যায় বা যান চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে, তবে মাগুরাছড়া, পশ্চিম পাঠাখাউরী, সিমসিমপুরসহ প্রায় ২০টি গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে থমকে যাবে।
বিশেষ করে এই অঞ্চলের মুমূর্ষু রোগী, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, স্থানীয় কৃষক এবং ছোট ব্যবসায়ীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হবে। উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেলে অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন হয়ে পড়বে এই জনপদের মানুষ।
উন্নয়নের নামে এই প্রহসনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেতুর পাশে সমবেত হয়ে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাঁদের সাফ কথা, কোনো বড় বিপর্যয় বা প্রাণহানির পর প্রশাসন দায়সারা তদন্তের নাটক করবে, আর সাধারণ মানুষ বলি হবে, তা আর কোনোমতেই বরদাস্ত করা হবে না।
ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে স্থানীয় জনগণ অবিলম্বে শ্রীভূমি জেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট পূর্ত বিভাগ, রাজ্যের পূর্তমন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল এবং স্থানীয় বিধায়ক বিজয় মালাকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁরা অত্যন্ত জোরালো দাবি তুলেছেন যে, অনতিবিলম্বে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী বা ভিজিল্যান্স দল পাঠিয়ে সেতুর নিরাপত্তা ও ফাটলের প্রকৃত কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে, কাজের নামে এই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
সিংলা নদীর এই সেতু কেবল কিছু ইট, বালি আর সিমেন্টের গাঁথুনি নয়, এটি প্রায় কুড়িটি গ্রামের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান ভরসা। জনস্বার্থের এই গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো রক্ষায় প্রশাসন যদি এখন থেকেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে আগামী দিনে বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবেন এলাকাবাসী। উন্নয়নের ফাঁপা বেলুন চুপসে যাওয়ার পর টনক নড়বে তো প্রশাসনের? এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় সমগ্র রামকৃষ্ণনগরবাসী।





