ভাগাবাজার রাজঘাটের সঞ্জয় রোড অবহেলায় মৃত্যুফাঁদে পরিণত, নিজেদের টাকায় মেরামতে নামলেন যুবকরা

ফলে এলাকাবাসীর ক্ষোভ দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। স্থানীয়দের মতে, সঞ্জয় রোড কেবল একটি গ্রামীণ রাস্তা নয়, এটি রাজঘাট, ভাগাবাজারসহ আশপাশের একাধিক গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের প্রধান ভরসা। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, রোগী বহনকারী যানবাহন সবার জন্যই এই রাস্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বাস্তব চিত্র এমন যে, রাস্তার বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, কোথাও পিচ উঠে গেছে, আবার কোথাও রাস্তার অস্তিত্বই প্রায় বিলীন হয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাস্তার প্রস্থ অত্যন্ত সংকীর্ণ। একটি অটোরিকশা ও একটি মোটরসাইকেল নিরাপদে একে অপরকে অতিক্রম করতে গেলেও বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়। সামান্য অসাবধানতায় দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা সবসময়ই থেকে যাচ্ছে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বৃষ্টির পানি জমে গর্তগুলো ছোট ছোট পুকুরে পরিণত হয়। ফলে চালকরা গর্তের গভীরতা বুঝতে না পেরে দুর্ঘটনার শিকার হন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বহুবার মোটরসাইকেল আরোহী ও সাইকেল চালকরা এই গর্তে পড়ে আহত হয়েছেন।

বিশেষ করে রাতের বেলায় রাস্তার অবস্থা আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, কোনো বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটার পরই কি প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে? রাস্তার মাঝামাঝি অংশে অবস্থিত পানি সাগর খালের ওপর নির্মিত ছোট্ট ব্রিজটির অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্রিজটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সুরক্ষা ব্যারিয়ার দুর্বল হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও ভাঙনের চিহ্নও স্পষ্ট। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত মেরামত না করা হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে ভারী যানবাহন চলাচলের সময় ব্রিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

অভিযোগ উঠেছে, অতীতে রাস্তার কিছু অংশে ব্লক বসানোর কাজ করা হলেও সেই কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ ব্লক উঠে গিয়ে রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। ফলে যানবাহন চলাচল আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, সরকারি অর্থ ব্যয় করে কাজ করা হলেও তার স্থায়িত্ব ছিল না বললেই চলে। ফলে জনগণের করের টাকা কতটা সঠিকভাবে ব্যয় হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে যখন সরকারি উদ্যোগ চোখে পড়ছে না, তখন এলাকার একদল সচেতন যুবক মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে নিজেরাই রাস্তা সংস্কারের কাজে নেমে পড়েছেন। কেউ ব্যক্তিগতভাবে অর্থ সাহায্য করছেন, কেউ আবার স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে গর্ত ভরাট, ইটের খোয়া বিছানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোকে চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজের দুই পাশে বাঁশের অস্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থাও তৈরি করেছেন তারা। তাদের এই উদ্যোগ এলাকাজুড়ে প্রশংসা কুড়ালেও একইসঙ্গে প্রশাসনিক ব্যর্থতার নগ্ন চিত্রও তুলে ধরেছে।

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, যে কাজ সরকারের করার কথা, সেই কাজ আজ সাধারণ মানুষকে নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে করতে হচ্ছে। এটি শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয়, বরং উন্নয়নের দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। বিভিন্ন সময়ে উন্নয়নের বড় বড় দাবি ও প্রচারণা শোনা গেলেও বাস্তবে মানুষের মৌলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার এমন করুণ অবস্থা সেই দাবির বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষুণ্ন করছে।

অঞ্চলবাসীর অভিযোগ, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা বহুবার এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নির্বাচনের সময় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। ফলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে।

স্থানীয় মানুষের দাবি, সঞ্জয় রোডকে আর অস্থায়ী মেরামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কারিগরি সমীক্ষা করে রাস্তার প্রস্থ বৃদ্ধি, স্থায়ীভাবে পাকা সংস্কার, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং পানি সাগর খালের ওপর অবস্থিত ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজের আধুনিকীকরণ জরুরি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

এলাকাবাসী বিনম্র কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন,  আর কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির অপেক্ষা নয়, অবিলম্বে সঞ্জয় রোডের স্থায়ী সংস্কার এবং ব্রিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। কারণ নিরাপদ যোগাযোগ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি জনগণের মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই।

Related Posts

ভোট শেষ, সুবিধাও শেষ! নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি উধাও, বন্ধ ১০০ টাকার ডাল-চিনি-লবণ প্রকল্প

রেশন কার্ডধারীদের কপালে বাড়তি খরচের বোঝা, বাজেট সংকটের অজুহাতে অনিশ্চয়তায় লক্ষ লক্ষ পরিবার নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতির ঝড়, ভোটের পর বাস্তবতার কঠিন ধাক্কা। অসমের প্রায় ৭০ লক্ষ রেশন কার্ডধারী পরিবারকে স্বস্তি…

ডবল ইঞ্জিন সরকারের জিরো টলারেন্স কি ফাইলবন্দি? ১৫ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকার সংস্কার কোথায়? মরণফাঁদে পরিণত ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক, ক্ষোভে ফুঁসছে বরাক ও তিন রাজ্যের মানুষ

ভাঙাচোরা সড়কে নিত্য দুর্ভোগে রোগী, ছাত্রছাত্রী, যাত্রী ও তিন রাজ্যের পণ্যবাহী যানচালকরা, উঠছে দুর্নীতি তদন্তের দাবি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২মেঃ ডবল ইঞ্জিন সরকারের উন্নয়নের অঙ্গীকার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *