‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ কর্মসূচির মাঝেও মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের ঝরে পড়ার হার একাধিক বিজেপি-শাসিত রাজ্যে

রাজ্যসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সাগরিকা ঘোষের লিখিত প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশী ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষের ‘ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন প্লাস (ইউডাইস প্লাস)’ এর তথ্য তুলে ধরেছেন। সেই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নবম ও দশম শ্রেণিতে দেশের জাতীয় স্কুলছুটের হার ৯.৫ শতাংশ। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, একাধিক বিজেপি শাসিত রাজ্যে এই হার জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে গুজরাতে, যেখানে স্কুলছুটের হার ১৫.৭ শতাংশ। অসমে এই হার ১৪.৩ শতাংশ, ওড়িশায় ১৩.৭ শতাংশ, মধ্যপ্রদেশে ১৩ শতাংশ এবং ত্রিপুরায় ১০.৪ শতাংশ। অর্থাৎ, যে রাজ্যগুলিকে উন্নয়ন ও সুশাসনের মডেল হিসেবে তুলে ধরা হয়, সেখানেই মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদ্যালয় ছেড়ে যাচ্ছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো ছাত্রীদের স্কুলছুটের হার।

কেন্দ্রীয় সরকারের বহুল প্রচারিত ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’কর্মসূচির পরও নবম ও দশম শ্রেণির ছাত্রীদের জাতীয় স্কুলছুটের হার ৮ শতাংশ। অথচ অসমে তা ১৩.৯ শতাংশ, গুজরাতে ১৩.৩ শতাংশ, মধ্যপ্রদেশে ১১.৩ শতাংশ, ওড়িশায় ১১.২ শতাংশ এবং ত্রিপুরায় ৯.৭ শতাংশ। অর্থাৎ, জাতীয় গড়ের তুলনায় এই রাজ্যগুলিতে মেয়েদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

অন্যদিকে, একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে সার্বিক স্কুলছুটের হার ৫.৫ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ বলে কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক কম। গত এক দশকে কেন্দ্রীয় সরকার শিক্ষা ও নারীশিক্ষা নিয়ে একাধিক কর্মসূচির প্রচার করেছে। ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’, ‘সমগ্র শিক্ষা অভিযান’, ‘পিএম পোষণ’এসব প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যালয়ে ভর্তি বৃদ্ধি, ঝরে পড়া কমানো এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন। কিন্তু সংসদে পেশ করা সরকারি তথ্যই ইঙ্গিত দিচ্ছে, বহু রাজ্যে বাস্তব পরিস্থিতি এখনও আশানুরূপ নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোই যথেষ্ট নয়, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক অনটন, অল্প বয়সে শ্রমে যুক্ত হওয়া, পারিবারিক দায়িত্ব, অল্প বয়সে বিয়ে, বিদ্যালয়ের দূরত্ব, শিক্ষক সংকট, পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো একাধিক কারণ এখনও স্কুলছুটের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, স্কুলছুটের হার কমাতে কেন্দ্র সরকার ভবিষ্যতে কী নতুন পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে লিখিত উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী কোনো নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেননি। তিনি মূলত সমগ্র শিক্ষা অভিযান, পিএম পোষণ প্রকল্প এবং রাজ্যগুলিকে আর্থিক সহায়তার মতো চলমান কর্মসূচির কথাই উল্লেখ করেছেন।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, যদি এত বছর ধরে চলা প্রকল্পগুলির পরও জাতীয় গড়ের তুলনায় একাধিক রাজ্যে স্কুলছুটের হার এত বেশি থাকে, তবে বর্তমান নীতিগুলির কার্যকারিতা কতটা? নতুন করে সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন কি আরও জোরালো হয়ে ওঠেনি?

একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয় ছেড়ে দিলে তা শুধু একটি সংখ্যা বৃদ্ধি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ গঠনের প্রশ্ন। বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের হার বেশি হওয়া মানে উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের পথও সংকুচিত হয়ে যাওয়া।

তাই শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল প্রকল্পের ঘোষণা বা বিজ্ঞাপনী প্রচার নয়, প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের দ্রুত শনাক্তকরণ, দরিদ্র পরিবারের জন্য আরও কার্যকর সহায়তা, বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা।

সংসদে কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া এই পরিসংখ্যান তাই শুধু একটি প্রশাসনিক রিপোর্ট নয়, এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে থাকা কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই সতর্কবার্তাকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবসম্মত ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। 

Related Posts

কালাইন কো-অপারেটিভে প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা (পিএমজিকেএওয়াই) চাল পরিবহণে কোটি টাকার ঘাপলা!

বিল হচ্ছে রামনগরের নামে, চাল আসছে বদরপুর এফসিআই থেকে! গাড়িপ্রতি ২,৩০০ টাকার ভুয়া বিল বানিয়ে পকেটস্থ! বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ অক্টোবরঃ সরকারি সমবায় ব্যবস্থায় কি শেষপর্যন্ত দুর্নীতির ঘুণ ধরেছে? কালাইন…

মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কাছাড়ের লক্ষ্মীপুরের বুকে দিব্যি চলছে অবৈধ লটারির রমরমা জুয়ার আসর

আদালতের নিষেধাজ্ঞা শিকেয় তুলে রমরমা! লক্ষ্মীপুরে লটারির নামে কোটি টাকা হাতিয়ে চম্পট প্রতারক চক্র বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক 28 অক্টোবরঃ মহামান্য আদালত এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্পষ্ট ফরমান রাজ্যে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *