বন্যার প্রকোপ কমলেও সংকট কাটেনি, অসমের ৮ জেলায় এখনও ২.১২ লক্ষাধিক মানুষ জলবন্দি

অসম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এএসডিএমএ)এর তথ্য অনুযায়ী, গোলাঘাট, শিবসাগর, বিশ্বনাথ, চরাইদেও, কামরূপ (গ্রামীণ), যোরহাট, ধেমাজি এবং নগাঁও জেলায় এখনও বন্যার প্রভাব অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে মোট ২,১২,৪৪১ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া ১৭,১৯৮.০৯ হেক্টর কৃষিজমি এখনও জলের নিচে থাকায় কৃষকদের দুর্দশা চরমে পৌঁছেছে। ধান, শাকসবজি, পাট, তিলসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতির ফলে বহু কৃষক গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

বন্যাকবলিত বহু এলাকায় এখনও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। হাজার হাজার মানুষ সরকারি ত্রাণ ও আশ্রয় শিবিরে অবস্থান করছেন। প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি সামগ্রী সরবরাহ করলেও বহু অঞ্চলে জনজীবন এখনও স্বাভাবিক হয়নি।

এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার রাতে ফেসবুক লাইভে রাজ্যবাসীর উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। বিশেষ করে বন্যাকবলিত মানুষের ঋণ সংক্রান্ত ঘোষণাগুলি ব্যাপক তাৎপর্য বহন করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই বিষয়ে তিনি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী স্টেট লেভেল ব্যাংকিং কমিটি এর সঙ্গে একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক, নাবার্ড এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে বন্যাকবলিত মানুষের ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন।

ব্যাংকগুলির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিবসাগর, চরাইদেও, যোরহাট এবং গোলাঘাট জেলায় প্রায় ৩.১৮ লক্ষ সক্রিয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টের আওতায় মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১,৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি ঋণ, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের ঋণ, ক্ষুদ্র ও লঘু শিল্প উদ্যোক্তাদের ঋণ এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ঋণ। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, ঋণ মকুব বা বিশেষ সুবিধা শুধুমাত্র প্রকৃত বন্যাদুর্গত এবং যোগ্য উপভোক্তারাই পাবেন।

এর আগে সরকার ক্ষয়ক্ষতির তথ্য, প্রশাসনিক রিপোর্ট এবং ব্যাংকের নথিপত্র বিস্তারিতভাবে যাচাই করবে। কেউ যদি ভুয়া তথ্য দিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁকে এই প্রকল্পের বাইরে রাখা হবে এবং তাঁকে নিয়ম অনুযায়ী নিজের ঋণ নিজেকেই পরিশোধ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার কোনো দায়িত্ব নেবে না বলেও তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন।

তিনি আরও বলেন, শিবসাগর, চরাইদেও, যোরহাট ও গোলাঘাট জেলার বাসিন্দা হলেও যাঁরা বন্যার কারণে কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হননি, তাঁরা এই বিশেষ ঋণ-সুবিধার আওতায় আসবেন না। অর্থাৎ শুধুমাত্র প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্যই এই সহায়তা প্রযোজ্য হবে। এছাড়া মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, গৃহঋণ, শিক্ষাঋণ এবং গাড়ির ঋণের কিস্তি পরিশোধে ছয় মাস পর্যন্ত রেহাই (মরাটোরিয়াম) দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

একইভাবে কৃষি ঋণ এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও ছয় মাসের জন্য রেয়াত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা, এই সিদ্ধান্তের ফলে বন্যায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার পরিবার সাময়িক স্বস্তি পাবে এবং পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।

এদিকে, বিভিন্ন এলাকায় বন্যার জল ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু, কৃষিজমি এবং জনপরিকাঠামো পুনর্গঠনের বিশাল চ্যালেঞ্জ এখনও প্রশাসনের সামনে রয়ে গেছে। বন্যায় বিপর্যস্ত হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি, জীবিকা ও ফসল হারিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকা পুনরুদ্ধার এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।

শুধু ত্রাণ বিতরণ বা সাময়িক আর্থিক সহায়তা দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, কৃষি উৎপাদন পুনরুজ্জীবন, ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্নির্মাণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করতে সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি সরকারি সহায়তা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে পৌঁছানো নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত ঋণ-সহায়তা, কিস্তি পরিশোধে ছয় মাসের রেয়াত এবং পুনর্বাসনমূলক উদ্যোগগুলি যদি সময়মতো ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বন্যাদুর্গত মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে এবং তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত হবে বলে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক মহলের অভিমত।

Related Posts

নেতা-আমলাদের গাড়ির সাইরেনেই শেষ চিকিৎসা? পরিদর্শনের নামে বড় বড় কথা, কাজের বেলায় অশ্বডিম্ব!

২৫টি পদ খালি রেখে কেমন মডেল পরিষেবা? পেটে সন্তান নিয়ে শিলচরে ছুটছেন মায়েরা, নীরব বিধায়ক ও জেলা প্রশাসন বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১আগষ্ট, ২০২৬: কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঝকঝকে অট্টালিকা আজও মাথা…

কাছাড়ের জয়নগর কুমারপাড়ায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা

একজনকে বাঁচাতে গিয়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে একে একে নিভে গেল ৪টি তাজা প্রাণ, বাড়ির মালিক আটক, এলাকা জুড়ে শোকের ছায়া বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১আগষ্ট, ২০২৬: নিরাপত্তা সরঞ্জামের ছিটেফোঁটাও ছিল না, ছিল…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *