বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, হাইলাকান্দি, ১৫ আগষ্টঃ পারিবারিক কলহ ও পরকীয়ার জেরে এক গৃহবধূর রহস্যজনক ও করুণ মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে পুরো হাইলাকান্দি জেলাজুড়ে। চিপরসাঙ্গন পাঠ-২ এলাকার কন্যা হাসিনা বেগম মজুমদারের (২৮) মর্মান্তিক এই মৃত্যুকে কোনো স্বাভাবিক ঘটনা বলে মানতে নারাজ তাঁর পৈতৃক পরিবার। স্বজনদের অভিযোগ, স্বামীর পরকীয়ার প্রতিবাদ করায় গৃহবধূর ওপর চরম নৃশংস শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং পরবর্তীতে তাঁকে জোরপূর্বক বিষ জাতীয় তরল খাইয়ে হত্যা করা হয়েছে! ঘটনার পর তড়িঘড়ি অভিযানে নেমে মৃতার অভিযুক্ত স্বামীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে দাবি করেছে পরিবার।
পরিবার সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চিপরসাঙ্গন পাঠ-২ এলাকার বাসিন্দা জুয়াইদ আলী মজুমদারের কন্যা হাসিনা বেগম মজুমদারের বিয়ে হয়েছিল রাঙ্গাউটি প্রথম খণ্ড এলাকার কদর আলী মজুমদারের ছেলে সাহেদ আহমেদ মজুমদারের সঙ্গে। বিয়ের পর তাঁদের সংসারে আলো করে আসে দুই সন্তান। কিন্তু অভিযোগ, সুখে শান্তিতে কাটতে থাকা দাম্পত্য জীবনে হঠাৎ করেই ঘনিয়ে আসে অমাবস্যার অন্ধকার।
মৃতার স্বজনদের দাবি, স্বামী সাহেদ আহমেদ মজুমদার বিবাহবহির্ভূত অবৈধ সম্পর্কে (পরকীয়ায়) জড়িয়ে পড়েছিলেন। বিষয়টি জানতে পেরে পৈতৃক পরিবারের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিবাদ জানান হাসিনা বেগম। আর তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে স্বামী সাহেদসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন। প্রতিবাদ করায় দিনের পর দিন হাসিনার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো বলে অভিযোগ। সম্প্রতি এই কলহ চরম আকার ধারণ করে।
ঘটনার রাতে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর বিবরণ দিয়েছেন মৃতার পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের আগে হাসিনার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়, যার ফলে তাঁর হাতে গুরুতর আঘাত লাগে। এখানেই শেষ নয়, স্বজনদের বিস্ফোরক অভিযোগ, শারীরিকভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়ার পর অভিযুক্ত স্বামী ও পরিবারের সদস্যরা মিলে হাসিনাকে বলপূর্বক কোনো বিষাক্ত পদার্থ বা বিষ খাইয়ে দেয়। পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত গোপনে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল শ্বশুরবাড়ির লোকজন।
ঘটনার ভয়াবহতা টের পেয়ে শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন সহানুভূতিশীল প্রতিবেশী গোপনে হাসিনার বাপের বাড়িতে খবর দেন। প্রতিবেশীদের সহায়তাতেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসিনাকে উদ্ধার করে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় হাইলাকান্দি সিভিল হাসপাতালে। হাইলাকান্দি সিভিল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর গৃহবধূর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা আর ঝুঁকি নেননি।
তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তড়িঘড়ি স্থানান্তর করা হয় শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে । কিন্তু সেখানে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন দুই সন্তানের জননী হাসিনা বেগম। হাসিনার মৃত্যুর সংবাদ হাইলাকান্দিতে পৌঁছাতেই শোক ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। এক প্রস্ফুটিত প্রাণ এভাবে শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারের বলি হওয়ায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন প্রতিবেশীরা।
এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচারের আশায় মৃতার পরিবারের পক্ষ থেকে হাইলাকান্দি সদর থানায় একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। পরিবার সূত্রের দাবি, অভিযোগের ভিত্তিতে তৎপরতা দেখিয়ে পুলিশ ইতোমধ্যেই প্রধান অভিযুক্ত স্বামী সাহেদ আহমেদ মজুমদারকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে মৃতার পরিবার এবং এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, এই নৃশংস কাণ্ডে কেবল স্বামী সাহেদ একা জড়িত নয়।
গৃহবধূর ওপর নির্যাতন এবং জোরপূর্বক বিষ খাওয়ানোর পেছনে তাঁর শাশুড়িরও সক্রিয় ইন্ধন ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। স্বজনদের কড়া দাবি, অবিলম্বে অভিযুক্ত শাশুড়িকেও গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে এনে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যান্য সহযোগীদেরও তদন্তের জালে এনে আইনি ব্যবস্থার সম্মুখীন করতে হবে। দুই এতিম শিশুর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে দোষীদের সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে স্থানীয় থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে। মৃতদেহের ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ প্রশাসন। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে তোলা এই গুরুতর অভিযোগগুলোর সত্যতা ও বিষপ্রয়োগের বিষয়টি বর্তমানে পুলিশি তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়াধীন।
ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট এবং পুলিশের নিরপেক্ষ তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে এই রহস্যজনক মৃত্যুর পেছনের আসল সত্য। অন্যদিকে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে অপরাধীদের কঠিন শাস্তি দিতে একজোটে সরব হয়েছেন হাইলাকান্দির আমজনতা।





