লক্ষীপুর শিক্ষা খণ্ডে শিক্ষক বণ্টনে চরম অনিয়ম, নজিরবিহীন বৈষম্যে ভেঙে পড়েছে গ্রামীণ শিক্ষার মেরুদণ্ড
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৭ আগষ্টঃ লক্ষীপুর শিক্ষা খণ্ডের অধীনস্থ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক বণ্টনের এক নজিরবিহীন অসঙ্গতি ও শিক্ষা বিভাগের চরম ব্যর্থতার চিত্র সামনে এসেছে। সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ এবং ‘শিক্ষার অধিকার আইন’-এর ঢোল পেটানোর মাঝেই সমগ্র ব্লক জুড়ে ছাত্র-শিক্ষকের এই তীব্র ভারসাম্যহীনতায় গ্রামীণ এলাকার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে। স্থানীয় অভিভাবক, পড়ুয়া ও সচেতন মহলের গুরুতর অভিযোগ, শিক্ষা বিভাগের ভুল শিক্ষক প্রক্ষেপণ নীতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণেই আজ এই বিপর্যয়।
সমগ্র লক্ষীপুর শিক্ষা খণ্ডে অনুসন্ধান চালাতেই ভেসে উঠেছে এক অদ্ভুত ও বৈষম্যমূলক দৃশ্য। একদিকে যেখানে ব্লক জুড়ে ১৫০ জন বা শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র একজন বা দুজন শিক্ষক কোনোমতে দিন গুজরান করছেন, সেখানে পঠন-পাঠন শিকেয় তুলে শিক্ষক মহাশয়দের সামলাতে হচ্ছে মিড-ডে মিল ও অফিশিয়াল কাগজের পাহাড়। এমনকি এমন অনেক স্কুলও রয়েছে যেখানে ছাত্র আছে, আস্ত স্কুল ঘরও আছে, কিন্তু কোনো স্থায়ী শিক্ষক নেই! অন্য স্কুলের শিক্ষককে প্রেষণে বা অতিরিক্ত দায়িত্বে এনে কোনোক্রমে প্রশাসনিক কাজ চালানো হচ্ছে।
অথচ এর ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে শিক্ষা বিভাগের এক চরম বিলাসিতার ছবি ফুটে উঠেছে, যা দেখে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! এই চরম অসাম্যের এক জ্বলন্ত ও চাঞ্চল্যকর উদাহরণ লক্ষীপুর শিক্ষা খণ্ডের অন্তর্গত ১২৮৪ নং চাপ্রৌ এল.পি স্কুল। নামেই প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্তু বাস্তবে এটি শিক্ষা বিভাগের খামখেয়ালিপনার এক জ্যান্ত প্রদর্শনী। নথি অনুযায়ী ‘ক’-মান ধরে মোট ছাত্র সংখ্যা ১০ দেখালেও শ্রেণীকক্ষে চোখ রাখলে বাস্তবটা বোঝা যায়। দ্বিতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীতে একজনও ছাত্র নেই! নিয়মিত স্কুলে আসে মাত্র ৪ জন পড়ুয়া।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, বিদ্যালয়ে মাত্র ৪ থেকে ১০ জন পড়ুয়ার দেখভাল ও পড়াশোনার জন্য কর্মরত রয়েছেন চারজন পূর্ণসময়ের শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রধান শিক্ষক বসন্ত সিংহ, ডব্লিউ. সত্যবতী সিংহ, এম. ঙান্থাওলেম্বী সিংহ এবং ডব্লিউ. সুর্য্য সিংহ। অর্থাৎ, বিদ্যালয়ের পড়ুয়ার সংখ্যা যদি বাস্তবে ৪ জনের কাছাকাছি হয়, তাহলে প্রায় প্রত্যেক পড়ুয়ার জন্যই রয়েছেন একজন করে শিক্ষক। আর পড়ুয়ার সংখ্যা নথিভুক্ত ১০ জন হলেও শিক্ষক-পড়ুয়ার অনুপাত কার্যত নজিরবিহীন।
মাত্র কয়েকজন অনিয়মিত পড়ুয়ার জন্য চারজন পূর্ণসময়ের শিক্ষক নিয়োগের এই চিত্র শুধু বিস্ময়করই নয়, সরকারি অর্থ ও জনসম্পদের ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। যেখানে বহু বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেখানে একটি বিদ্যালয়ে এত কম পড়ুয়ার বিপরীতে চারজন শিক্ষক বহাল থাকার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই নজর কেড়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিদ্যালয়ে প্রাক্-প্রাথমিক বা ‘ক’ শ্রেণির ছোট শিশুদের শিক্ষা দফতরের তরফে মিড-ডে মিল দেওয়া হলেও তাদের জন্য স্কুল ইউনিফর্ম সরবরাহ করা হয় না। ফলে জামাকাপড়ের অভাবে ছোট ছোট পড়ুয়াদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসার আগ্রহও কমছে বলে অভিযোগ। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয়ের সামগ্রিক উপস্থিতির ওপর।
যদিও বিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ মানতে নারাজ প্রধান শিক্ষক বসন্ত সিংহ। তাঁর দাবি, সরকারি নথি অনুযায়ী বিদ্যালয়ে মোট ১০ জন পড়ুয়া রয়েছে এবং তাঁরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে। তবে সরেজমিনে দেখা বাস্তব চিত্র প্রধান শিক্ষকের এই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ।
ফলে সরকারি নথিতে দেখানো পড়ুয়ার সংখ্যা, তাঁদের প্রকৃত উপস্থিতি এবং চারজন পূর্ণসময়ের শিক্ষক নিয়োগ এই তিনটি বিষয় নিয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা দফতরের তরফে বিদ্যালয়টির বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি।
শিক্ষা বিভাগের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন নীতির ফলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থ ও মানবসম্পদের বিপুল অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে শতাধিক পড়ুয়া থাকা পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়গুলি তীব্র শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানের ওপর, অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ।
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক যুক্তিসঙ্গতকরণ না হওয়ার কারণেই এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষক থাকলেও, অন্যদিকে বহু বিদ্যালয়ে পড়ুয়ার অনুপাতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে চরম বৈষম্য এবং ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পঠন-পাঠন।
তবে পরিস্থিতি পরিবর্তনের উদ্যোগ শুরু হয়েছে বলেও জানা গেছে। বর্তমান ব্লক প্রাথমিক শিক্ষাধিকারিক এই দীর্ঘদিনের নড়বড়ে ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে দ্রুত শিক্ষক যুক্তিসঙ্গতকরণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক বণ্টন করা গেলে একদিকে যেমন সরকারি মানবসম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে শিক্ষক সংকটে থাকা বিদ্যালয়গুলিও স্বস্তি পাবে।
দাবি একটাই, অবিলম্বে লক্ষীপুর শিক্ষা খণ্ডের প্রতিটি স্কুলে শিক্ষক বণ্টনের এই চরম অসঙ্গতি দূর করে উদ্বৃত্ত শিক্ষকদের অভাবগ্রস্ত স্কুলগুলিতে বদলি করা হোক এবং শিশুদের জন্য একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক পঠন-পাঠনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক। শিক্ষা বিভাগ কি আদৌ ঘুম ভাঙবে, নাকি এইভাবেই ভেঙে পড়বে লক্ষীপুরের প্রাথমিক শিক্ষার মেরুদণ্ড? নজর থাকবে সেদিকেই।






