বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৭ আগষ্টঃ জুলাইর ভয়াবহ বন্যার পর শিবসাগর জেলায় শুরু হওয়া দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন সমীক্ষার প্রায় ৮৫ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চলা এই সমীক্ষায় এখনও পর্যন্ত প্রায় ৪২,৫০০টি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁতশিল্প, গবাদিপশু, ছাগল, শূকর ও হাঁস-মুরগির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে।
গত ৯ আগস্ট থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় মোট ৫৭৪ জন সমীক্ষককে কাজে নিয়োগ করা হয়েছে। বন্যায় ‘গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ পরিবারগুলির ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পাশাপাশি তাঁদের ঘরবাড়ি ও জীবিকার ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছেন তাঁরা। আগামী ৩০ আগস্ট পর্যন্ত এই সমীক্ষার কাজ চলবে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এখনও সমীক্ষার আওতায় না এসে থাকলে দ্রুত স্থানীয় সমীক্ষক, পঞ্চায়েত সভাপতি অথবা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নাম ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নথিভুক্ত করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়েছে।
এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে রাজ্য সরকারের ঘোষিত ১৫ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। গত ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ৫৮,৭৯৫ জন উপভোক্তার ব্যাংক হিসাবে সরাসরি এই অর্থ জমা হয়েছে। তবে আরও প্রায় ৭,৫০০ জনের অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া প্রথম দফায় ব্যর্থ হয়।
ব্যাংক হিসাব নম্বর, আইএফএসসি কোড অথবা অন্যান্য তথ্যের অসঙ্গতির কারণে এই সমস্যা দেখা দেয়। সংশোধিত তথ্য গত ১৯ আগস্ট অসম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনের আশা, সংশ্লিষ্ট উপভোক্তারা চলতি সপ্তাহের মধ্যেই তাঁদের প্রাপ্য অর্থ পেয়ে যাবেন।
এছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আরও প্রায় ৬,০০০ জন ব্যক্তি সরাসরি শিবসাগরের জেলাশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করেছিলেন। তাঁদের নামের তালিকাও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য অসম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, আর্থিক সহায়তা প্রদানের আগে প্রতিটি তথ্য একাধিক স্তরে যাচাই করা হচ্ছে।
অসম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, রাজ্য অর্থ দফতর এবং ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের যাচাইয়ের পরই উপযুক্ত উপভোক্তার ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হচ্ছে। জেলাশাসকের কার্যালয়ে থাকা বাকি আবেদনগুলির তথ্য বর্তমানে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নথিভুক্ত ও যাচাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষ হলে যোগ্য উপভোক্তাদের নাম চূড়ান্ত অর্থপ্রদানের জন্য রাজ্য কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হবে।
বন্যার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার পাশাপাশি অসমের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষাতেও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। বন্যায় জল ও আর্দ্রতার কারণে বহু প্রাচীন পুঁথি ও হাতে লেখা ঐতিহাসিক নথি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সত্ৰ এবং ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের কাছে সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ পুঁথি সুরক্ষিত করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, বন্যা মোকাবিলার একটি ‘নীরব কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ অংশ হল প্রাচীন পুঁথি সংরক্ষণ। সরকারি দলগুলি বিভিন্ন সত্ৰ এবং ব্যক্তিগতভাবে পুঁথি সংরক্ষণকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। জল ও আর্দ্রতার হাত থেকে পুঁথিগুলি রক্ষা করার পাশাপাশি সেগুলির ডিজিটাল প্রতিলিপি তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
অসমের সত্ৰগুলিতে শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পুঁথি সংরক্ষিত রয়েছে। হাতে লেখা এইসব নথির অনেকগুলিই অত্যন্ত ভঙ্গুর। দীর্ঘ সময় জলে ভিজে থাকলে এগুলির কাগজ বা অন্যান্য উপাদান নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
ফলে বর্তমান উদ্যোগকে শুধু বন্যা-পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে নয়, অসমের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে মূল পুঁথিগুলি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে সংরক্ষণের চেষ্টা করা হবে, অন্যদিকে ডিজিটাল কপি তৈরি করে তাঁদের বিষয়বস্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা হবে।
বন্যাকবলিত এলাকার সত্ৰগুলির পাশাপাশি ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা গুরুত্বপূর্ণ পুঁথিগুলিকেও এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বন্যায় মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি ও জীবিকার পাশাপাশি ঐতিহাসিক সম্পদেরও ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই শিবসাগরে ক্ষয়ক্ষতি সমীক্ষা ও আর্থিক সহায়তার কাজের পাশাপাশি রাজ্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের এই উদ্যোগ অসমের সামগ্রিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।





