দ্বিতীয় দিনেও শ্রীভূমিতে বুলডোজার অভিযান, কান্নায় ভেঙে পড়ল একাধিক পরিবার

বিশেষ করে রমণী রোডে এক পরিবারের আর্তনাদ উপস্থিত সকলকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। উচ্ছেদের মুখে পড়া বাসিন্দাদের অভিযোগ, আইন ও মানবিকতার ন্যূনতম মানদণ্ডও অনুসরণ না করেই প্রশাসন এই অভিযান পরিচালনা করছে। তাঁদের দাবি, মাত্র তিন দিনের নোটিশ দিয়ে উচ্ছেদ কার্যকর করা হয়েছে, অথচ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সময় দিয়ে আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। অভিযোগ আরও গুরুতর, নোটিশে কোথায় কতটুকু অংশ ভাঙা হবে, তার কোনও সুস্পষ্ট বিবরণ ছিল না। ফলে মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বুঝতেই পারেননি তাঁদের কতখানি ক্ষতি হতে চলেছে।

বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, যথাযথ জরিপ বা নির্দিষ্ট মাপজোখ সম্পন্ন না করেই বুলডোজার চালিয়ে স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাঁরা জানান, এই ঘটনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে তাঁরা দাবি করেন, প্রশাসনের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আইনগত লড়াইও চালিয়ে যাবেন।

প্রসঙ্গত, গত ১৫ মে কয়েক ঘণ্টার প্রবল বর্ষণের পর শ্রীভূমি শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ব্রজেন্দ্র রোড এলাকায় বহু বাড়িতে হাঁটু থেকে কোমরসমান জল ঢুকে পড়ায় জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ওই ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিনের জলনিকাশির সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে সরব হন এবং পুরসভার পরিকল্পনাহীনতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

কিন্তু বাসিন্দাদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে প্রশাসন অবৈধ দখল উচ্ছেদের নামে সাধারণ মানুষের বাড়িঘরকেই নিশানা করেছে। তাঁদের দাবি, শহরের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি জমি দখল করে গড়ে ওঠা বহু বাজার ও বাণিজ্যিক স্থাপনার বিরুদ্ধে একই রকম কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জলাবদ্ধতার ঘটনার পর সদর সার্কেল অফিসের কর্মীরা এলাকায় গিয়ে মাপজোখ করেন এবং একাধিক স্থানে লাল দাগ দিয়ে সম্ভাব্য উচ্ছেদের চিহ্ন এঁকে দেন।

সেই সময় থেকেই বাসিন্দাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, গত ১ জুন জেলা কমিশনারের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত নাগরিক বৈঠকে রাজ্যের মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল শহরের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাজার ও স্ট্যান্ড অপসারণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এরপর প্রশাসন ঘাটলাইন ও পূর্ত বিভাগের কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় কিছু অবৈধ বাজার ভেঙে দিলেও, স্থানীয়দের অভিযোগ, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেগুলি আবার আগের জায়গাতেই চালু হয়ে যায়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসনের অভিযান কি সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে, নাকি নির্বাচিত এলাকাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?

এদিকে গত ২৫ জুন শ্রীভূমি পুরসভার কার্যনির্বাহী আধিকারিকের স্বাক্ষরিত নোটিশ ব্রজেন্দ্র রোড এলাকার ৬২টি পরিবারের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়। সেখানে মাত্র তিন দিনের মধ্যে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ ছিল। মঙ্গলবার চারটি জেসিবি নিয়ে প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে এবং বুধবারও তা অব্যাহত থাকে। সদর সার্কেল অফিসার বিকাশ ছেত্রী, পুরসভার কার্যনির্বাহী আধিকারিক প্রীতম শইকিয়া-সহ প্রশাসনের একাধিক আধিকারিক এবং বিশাল পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতিতে অভিযান পরিচালিত হয়। অনেক পরিবার ক্ষয়ক্ষতি কমানোর আশায় প্রশাসনের আগেই নিজেদের বাড়ি বা দোকানের কিছু অংশ নিজেরাই ভেঙে ফেলেন। তবুও বহু মানুষের দাবি, তাঁদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বিপুল এবং ভবিষ্যতে সেই ক্ষতি কীভাবে পূরণ হবে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও আশ্বাস মেলেনি।

বুধবারের অভিযানে সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যের সৃষ্টি হয় রমণী রোডে সুভাষ পালের বাড়িতে। বর্তমানে হোজাই জেলায় আবগারি বিভাগের আধিকারিক হিসেবে কর্মরত সুভাষ পাল কর্মস্থলে থাকায় বাড়িতে ছিলেন তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ে। প্রশাসনের দল পৌঁছতেই তাঁরা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং সদর সার্কেল অফিসার বিকাশ ছেত্রীর কাছে অন্তত দু’দিন সময় দেওয়ার জন্য আকুল আবেদন জানান। সুভাষ পালের ছেলে সাংবাদিকদের সামনে পুরসভার দেওয়া নোটিশ দেখিয়ে অভিযোগ করেন, ২৫ জুন ইস্যু হওয়া নোটিশ তাঁদের হাতে পৌঁছায় ২৬ জুন। এরপর ২৭ ও ২৮ জুন সরকারি ছুটি থাকায় তাঁরা প্রশাসনের কাছে আপত্তি বা বিকল্প আবেদন জানানোর কোনও কার্যকর সুযোগ পাননি।

তাঁর দাবি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী উচ্ছেদের আগে পর্যাপ্ত সময় ও শুনানির সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল, যা এই ক্ষেত্রে মানা হয়নি। এই উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে শহরজুড়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। নাগরিকদের একাংশের মতে, জলাবদ্ধতা নিরসন অবশ্যই জরুরি, তবে সেই প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত এবং মানবিক হয়। একই সঙ্গে শহরের সব ধরনের অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে সমান নীতি অনুসরণ করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের বক্তব্য শোনার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এই অভিযোগগুলির বিষয়ে জেলা প্রশাসন বা শ্রীভূমি পুরসভার পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। 

Related Posts

Is Cachar’s Sewa Setu Under the Grip of a Syndicate? General Citizens Allegedly Harassed by Middlemen at the Registration Office (PFC)

Allegations of Collusion Against PFC Staff as Victims Claim Transparency Has Been Replaced by Harassment Barak Bani Digital Desk,Silchar,19 July : The Assam Government introduced the Sewa Setu platform and…

Allegations of Money Collection in the Name of Hailakandi District Social Welfare Department Spark Concern

Complaint Filed at Katakhal Police Outpost Over Alleged Fraud of ₹90,500 from Several Anganwadi Workers Barak Bani Digital Desk, Hailakandi, July 8, 2026: A serious controversy has emerged surrounding the…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *