অগ্নিকাণ্ডের পর মিলেছিল বিপুল নগদ, পরে রহস্যজনকভাবে উধাও; তিন অভিযোগই সত্য বলে জানাল তদন্ত কমিটি
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৩ আগষ্টঃ বাইরে থেকে দেখলে দিল্লির তুঘলক ক্রিসেন্টের ৩০ নম্বর সরকারি বাংলোটি ছিল আর পাঁচটা সরকারি আবাসনের মতোই শান্ত ও নিরিবিলি। কিন্তু ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ রাতের একটি অগ্নিকাণ্ড সেই নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক বিস্ময়কর ঘটনার পর্দা সরিয়ে দেয়। আগুন নেভাতে এসে দমকলকর্মীরা যে দৃশ্য দেখতে পান, তা পরবর্তী সময়ে গোটা বিচারব্যবস্থাকে আলোড়িত করে স্টোররুমের ভিতরে ছড়িয়ে, ছিটিয়ে থাকা এবং স্তূপাকারে জমা বিপুল পরিমাণ পোড়া ৫০০ টাকার নোট!
সেই রাতের ঘটনাই শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় সংসদীয় তদন্তের দরজায়। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার গঠিত তিন সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি দীর্ঘ তদন্তের পর তাদের রিপোর্টে জানায়, তৎকালীন দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি যশবন্ত বর্মার বিরুদ্ধে ওঠা তিনটি অভিযোগই নিরপেক্ষ তদন্তে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। পরবর্তীকালে বিচারপতি বর্মা এলাহাবাদ হাইকোর্টে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন।
২০২৫ সালের ১৪ মার্চ রাত। সরকারি বাংলোর একটি স্টোররুমে আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পৌঁছন দমকলকর্মীরা। আগুন নেভানোর পর স্টোররুমে ঢুকেই তাঁদের চোখে পড়ে পোড়া নোটের স্তূপ। প্রথমে বিষয়টি অগ্নিকাণ্ডের একটি অস্বাভাবিক পরিণতি বলেই মনে হলেও, দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এটি নিছক আগুন লাগার ঘটনা নয়। স্টোররুমে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ থাকার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই প্রশ্ন ওঠে, এত টাকা সেখানে এল কোথা থেকে? কার টাকা? কেন সরকারি বিচারপতির আবাসনের একটি স্টোররুমে তা রাখা হয়েছিল? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আগুন লাগার আগে সেখানে কত টাকা ছিল? এই প্রশ্নগুলির কোনওটিরই সন্তোষজনক উত্তর তদন্ত কমিটির সামনে উঠে আসেনি।
ঘটনার পর বিচারপতি যশবন্ত বর্মা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সংশ্লিষ্ট স্টোররুমটি তাঁর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে ছিল না। এমনকি অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না বলেও দাবি করেন। কিন্তু তদন্ত কমিটি তাঁর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করেনি। কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, যে অংশে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ পাওয়া গিয়েছিল, সেটি বিচারপতির প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের আওতাতেই ছিল।
তদন্তে আরও উঠে আসে, সেখানে দু-একটি বিচ্ছিন্ন নোট পড়ে ছিল না। বরং ছিল টাকার বান্ডিল এবং স্তূপ। অর্থাৎ, ঘটনাটি কোনও সামান্য নগদ অর্থের উপস্থিতির বিষয় ছিল না; সেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ জমা ছিল। কিন্তু সেই অর্থের উৎস সম্পর্কে বিচারপতির কাছ থেকে এমন কোনও ব্যাখ্যা মেলেনি, যা তদন্তকারীদের সন্তুষ্ট করতে পারে। কমিটি তাঁর দেওয়া ব্যাখ্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাপূর্ণ, অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর বলে বর্ণনা করেছে।
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত অধ্যায় শুরু হয় আগুন নেভানোর পর। সাধারণ নিয়মে এমন একটি ঘটনাস্থল, যেখানে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ বস্তুগত প্রমাণ থাকতে পারে, সেটিকে সুরক্ষিত করে রাখা এবং পরবর্তী তদন্তের জন্য অপরিবর্তিত অবস্থায় সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, সেই স্টোররুম অবিলম্বে সিল করে নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়নি। বরং প্রথম সাড়াদানকারী কর্মীরা চলে যাওয়ার পরপরই স্টোররুম পরিষ্কার করার কাজ শুরু হয়। ফলে ঘটনাস্থলের মূল অবস্থার পরিবর্তন ঘটে যায়।
এরপর যখন আনুষ্ঠানিকভাবে স্থানটি পরিদর্শন করা হয়, তখন পরিস্থিতি আরও রহস্যজনক হয়ে ওঠে—আগুনের পর যে বিপুল নগদ অর্থের অস্তিত্ব সামনে এসেছিল, তার বড় অংশ আর সেখানে ছিল না। অর্থাৎ, যে নগদ অর্থ ঘটনাটিকে এত বড় তদন্তের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল, সেটিই পরে আর উদ্ধার করা যায়নি। এই মামলার অন্যতম বড় রহস্য হয়ে রয়েছে সেই রাতের নগদের প্রকৃত পরিমাণ।
কারণ, অর্থটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেয়াপ্ত করে গোনা বা নথিবদ্ধ করা হয়নি। ফলে সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়, স্টোররুমে ঠিক কত টাকা ছিল। আগুনের পরে পোড়া নোটের স্তূপ চোখে পড়লেও, সেই নগদের সম্পূর্ণ পরিমাণ, মালিকানা কিংবা উৎসের কোনও নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব তৈরি হয়নি। তদন্তের দৃষ্টিকোণ থেকে এটিই হয়ে ওঠে মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা। ফলে আজও প্রশ্ন থেকে যায়, সেই রাতে স্টোররুমে ঠিক কত নগদ টাকা ছিল এবং তার কতটা আগুনে নষ্ট হয়েছিল, আর কতটা পরে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল?
তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে বিচারপতির ব্যক্তিগত সচিব রাজিন্দর সিং কার্কি এবং গৃহপরিচারক মহম্মদ রাহিলের উপস্থিতির বিষয়টিও সামনে আসে। তবে তদন্ত কমিটি এমন কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি যে বিচারপতি যশবন্ত বর্মা নিজে ওই নগদ অর্থ সরিয়েছিলেন। অর্থাৎ, নগদ অর্থ উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রিপোর্টে দেওয়া হয়নি। কিন্তু তদন্ত কমিটি যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, তা হল, সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ বস্তুগত প্রমাণ সংরক্ষণে গুরুতর ব্যর্থতা ঘটেছিল। ঘটনাস্থল যথাযথভাবে সুরক্ষিত না করা এবং পরবর্তী সময়ে তা পরিষ্কার করে ফেলার ফলে তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট বা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় বিচারপতি বর্মার পক্ষ থেকে এমন একটি সম্ভাবনার কথাও উঠে আসে যে, তাঁকে ফাঁসানোর জন্য কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সেখানে টাকা রেখে থাকতে পারে। কিন্তু এই দাবির সমর্থনে তদন্ত কমিটির সামনে কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা সাক্ষ্য পেশ করা যায়নি। ফলে একদিকে যেমন নগদের উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, অন্যদিকে তাঁকে ফাঁসানোর জন্য চক্রান্ত করে টাকা রাখা হয়েছিল, এই দাবির পক্ষেও তদন্তে কোনও শক্ত প্রমাণ সামনে আসেনি।
দীর্ঘ তদন্তের পর তিন সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি বিচারপতি বর্মার বিরুদ্ধে ওঠা তিনটি অভিযোগকেই সত্য বলে চিহ্নিত করে। এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য ছিল অত্যন্ত গভীর। কারণ, অভিযোগগুলি শুধু একজন বিচারপতির ব্যক্তিগত আচরণকে ঘিরে ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বিচারপতির সরকারি আবাসন, বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, অগ্নিকাণ্ড, ঘটনাস্থল সংরক্ষণে ব্যর্থতা এবং পরবর্তী সময়ে নগদ অর্থের রহস্যজনক অন্তর্ধান। ফলে বিষয়টি দ্রুতই একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নৈতিকতার প্রশ্নে পরিণত হয়।
তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পর বিচারপতি যশবন্ত বর্মার বিরুদ্ধে সংসদীয় অপসারণ বা ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটেই তিনি এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন। পদত্যাগের ফলে তাঁকে সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপসারণের প্রশ্নটি কার্যত নিষ্পত্তি হয়ে যায়। তবে পদত্যাগ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তে কমিটির পর্যবেক্ষণকে মুছে দেয়নি।
এটিও মনে রাখা জরুরি, তদন্ত কমিটির এই সিদ্ধান্ত কোনও ফৌজদারি আদালতের দণ্ডাদেশ নয়। অর্থাৎ, এর ভিত্তিতে কোনও ফৌজদারি অপরাধে বিচারিক সাজা ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু বিচার বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগের তদন্তে যে তথ্য ও পর্যবেক্ষণ সামনে এসেছে, তার গুরুত্ব নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। তুঘলক ক্রিসেন্টের ৩০ নম্বর বাংলোর সেই অগ্নিকাণ্ড এখন শুধু একটি আগুন লাগার ঘটনা নয়। এটি পরিণত হয়েছে বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং বিচারকদের জবাবদিহি নিয়ে এক বড় বিতর্কের প্রতীকে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলি এখনও যেন বাতাসে ভাসছে, সেই বিপুল নগদ অর্থের প্রকৃত উৎস কী ছিল? আসল মালিক কে? আগুনের পর অর্থ কোথায় গেল? কেন ঘটনাস্থল যথাসময়ে সিল করা হল না? কেন সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংরক্ষণ করা গেল না? এবং শেষ পর্যন্ত, সেই রাতের স্টোররুমে ঠিক কত টাকা ছিল? সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো আর কোনওদিনই সম্পূর্ণভাবে জানা যাবে না। কিন্তু তদন্ত কমিটির রিপোর্ট একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, বিচারের আসনে বসা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে কেউ নন। তুঘলক ক্রিসেন্টের সেই আগুন হয়তো এক রাতেই নিভে গিয়েছিল। কিন্তু তার ছাই থেকে যে প্রশ্নগুলি উঠে এসেছে, তা ভারতীয় বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হতে থাকবে।





