জাতীয় সড়ক থেকে শহরের গলি, সর্বত্রই নরকযন্ত্রণা আর ভগ্ন সড়কে স্তব্ধ বরাক উপত্যকার জীবন

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রচারের সেই ঝকঝকে আলোর পেছনে যে নির্মম বাস্তবতা লুকিয়ে রয়েছে, তা প্রতিদিন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন এই অঞ্চলের হাজার হাজার বাসিন্দা। বাস্তবে ঘরের বাইরে পা রাখলেই সরকারি সেই উন্নয়ন এর মুখোস খুলে পড়ে ধূলো আর কাদার আস্তরণে। বরাক উপত্যকার মানচিত্রে চোখ বোলালে যে সত্যটা ফুটে ওঠে, তা রূপকথার ঠিক বিপরীত এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। এখানকার প্রতিটি সড়ক যেন এক-একটি আস্ত ফাঁদ, আর পুরো বরাক উপত্যকা আজ রূপান্তরিত হয়েছে এক অঘোষিত বন্দিশালায়।

জনপ্রতিনিধিদের উন্নয়নের বড়াই আর বাস্তবের খানাখন্দের মোড়কে ভরা দৈনন্দিন জীবনের বৈপরীত্য দেখে আজ স্থানীয় মানুষের একটাই প্রশ্ন, আমরা কি সত্যিই একই রাজ্যের বাসিন্দা, নাকি উন্নয়নের আলো থেকে সচেতনভাবেই বঞ্চিত এক উপেক্ষিত দ্বীপে আমাদের বসবাস? বরাকে এখন কোনও সড়কই চলাচলের যোগ্য নয়। শহরের পৌর এলাকা থেকে শুরু করে পূর্ত বিভাগের গ্রামীণ পথ সবত্রই ছবিটা এক। আর এনএইচআইডিসিএল এর আওতাধীন জাতীয় সড়কগুলির কথা না বলাই ভালো, সেখানে পিচ খুঁজে পাওয়া লটারি জেতার সমান, পথ জুড়ে শুধুই ছোট-বড় গর্তের মিছিল।

জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ এখন আর বাড়ি থেকে বেরনোর সাহস পান না। কিন্তু ঘরে বন্দি থেকে কি রক্ষা আছে? ভাঙাচোরা রাস্তায় প্রতিদিনের যাতায়াতে শারীরিক অসুস্থতা এখন ঘরে ঘরে। গাড়ির ঝাঁকুনিতে কোমরের ব্যাথা, মেরুদণ্ডের সমস্যা আর হাঁটু-পিঠের যন্ত্রণায় ভুগছেন আট থেকে আশীতিপর। অটো, রিকশা বা বাইকে চেপে গন্তব্যে পৌঁছানো মানেই জীবনের ঝুঁকি নেওয়া।

আমরা যেন আর মানুষ নই, স্রেফ ভোটব্যাংক! মুখ্যমন্ত্রীকে পুরো ভারতের সেরা উন্নয়নপুরুষ বলা হয়, অথচ তাঁর রাজ্যের একটা গোটা উপত্যকার রাস্তাঘাট মধ্যযুগীয় অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বড় বড় কথা আর ভাষণে আমাদের পেট ভরে না, পিঠের চামড়া তো আগেই উঠেছে, এবার হাড়ও ভাঙছে। ক্ষোভের সঙ্গে বললেন শিলচরের এক ভুক্তভোগী সাধারণ নাগরিক।

উপত্যকার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলির গলিঘুঁজি কোথাও একটুকরো ভালো রাস্তা খুঁজে পাওয়া দায়। পিচ উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই, রাস্তায় গর্ত হয়েছে, নাকি গর্তের মাঝে কিছুটা রাস্তা অবশিষ্ট আছে। বর্ষার দিনে সামান্য বৃষ্টিতেই সেই গর্তগুলো পরিণত হয় জলমগ্ন ডোবায়। ছোটখাটো দুর্ঘটনা এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। আশঙ্কাজনক কোনো রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া কিংবা গর্ভবতী মায়েদের অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়াটা এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় এক ভুক্তভোগী আক্ষেপের সুরে বলেন, মঞ্চে দাঁড়িয়ে নেতারা যখন লক্ষ লক্ষ টাকার বাজেট আর উন্নয়নের গল্প শোনান, তখন নিজেদের বোকা মনে হয়। আজ কথা বলতেও লজ্জা লাগে, আমরা কোন যুগে বাস করছি? পিচ উঠে গিয়ে ভেতরের সুরকি-পাথর বের হয়ে গেছে, অথচ কারো কোনো হেলদোল নেই।

স্থানীয়দের মূল ক্ষোভের জায়গাটি শুধু খারাপ রাস্তা নয়, বরং প্রকল্পের নিম্নমানের কাজ এবং প্রশাসনের উদাসীনতা নিয়ে। এলাকাবাসীর সরাসরি অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেখিয়ে তড়িঘড়ি করে যে কাজটুকু করা হয়, তা প্রথম কালবৈশাখী বা সামান্য বৃষ্টিতেই ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। নিম্মমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং ঠিকাদার-প্রশাসন আঁতাতের ফলে জনসম্পদের অপচয় ঘটছে অহরহ।

আজ পর্যন্ত কোনো ঠিকাদারকে নিম্নমানের কাজের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বা কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এমন উদাহরণ এই অঞ্চলে নেই। স্থানীয় প্রতিনিধিরা নির্বাচনের সময় ভোটের আশায় দ্বারে দ্বারে এসে যেসব প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছোটান, জয়ী হওয়ার পর তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন দেখা যায় না। সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকেই যেন এরা নিয়তি বলে ধরে নিয়েছেন।

রাস্তাঘাটের এই মর্মান্তিক পরিণতির পর শুরু হয় আসল খেলা, কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতি। বিরোধী দলগুলি সুর চড়াচ্ছে, আর শাসকদল দায় ঠেলছে অতীত সরকার বা ঠিকাদারদের ঘাড়ে। অথচ এই পারস্পরিক দোষারোপের খেলায় আসল বলির পাঁঠা হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। প্রকল্পের পর প্রকল্প অনুমোদন হয়, কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের খবর সংবাদপত্রের শিরোনাম কেড়ে নেয়।

কিন্তু সেই টাকা কোথায় যায়? কাজের মান নিয়ে কেন কোনও জবাবদিহিতা নেই? বর্ষা এলেই কেন পিচ ধুয়ে মুছে গিয়ে বেরিয়ে পড়ে ঠিকাদার ও প্রশাসনের দুর্নীতির নগ্ন কঙ্কাল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার মতো দায়বদ্ধতা কারও নেই। উন্নয়ন মানে তো কেবল রঙিন ফিতা কাটা আর এয়ারকন্ডিশন ঘরে বসে গালভরা বক্তৃতা দেওয়া নয়। প্রকৃত উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য ভালো রাস্তা, স্বচ্ছ কাজ, দুর্নীতিকামমুক্ত প্রশাসন এবং সর্বোপরি জবাবদিহিতা।

আজ এই চরম অব্যবস্থা ও বঞ্চনার বাস্তব সত্য তুলে ধরতেও লজ্জা লাগে। আসামের এক গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ অঞ্চল বরাক উপত্যকাকে কেন প্রতিনিয়ত এই চরম ভোগান্তির শিকার হতে হবে? জবাবদিহিতাহীন এই ব্যবস্থার অবসান কবে ঘটবে? নেতা-মন্ত্রীদের প্রতিশ্রুতি আর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার গল্প শুনতে শুনতে বরাকবাসী আজ ক্লান্ত। এখন আর ভাষণ নয়, মানুষ চান পিচঢালা নিরাপদ পথ। আর কত দিন এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করবে বরাক? সময় এসেছে জবাব চাওয়ার।

Related Posts

তুঘলক ক্রিসেন্টের বাংলোয় সেই রাতের পোড়া নোটের রহস্য, তদন্তে কাঠগড়ায় বিচারপতি বর্মা

অগ্নিকাণ্ডের পর মিলেছিল বিপুল নগদ, পরে রহস্যজনকভাবে উধাও; তিন অভিযোগই সত্য বলে জানাল তদন্ত কমিটি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৩ আগষ্টঃ বাইরে থেকে দেখলে দিল্লির তুঘলক ক্রিসেন্টের ৩০ নম্বর সরকারি…

সাবান-বিস্কুটেও মূল্যবৃদ্ধির আঁচ, সেপ্টেম্বরে আরও চাপে মধ্যবিত্তের সংসার

কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচের অজুহাতে দাম বাড়ানোর প্রস্তুতিতে একাধিক এফএমসিজি সংস্থা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৩ আগষ্টঃ রান্নাঘরের গ্যাস থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধিতে এমনিতেই চাপে সাধারণ মানুষের সংসার। এর…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *