‘মিশন ৩০’-এর ত্রাস কাটাতে কালাইনে ছাঁটাইয়ের ফন্দি? ফরম ফিলাপ থেকে বঞ্চিত দুই শতাধিক পড়ুয়া!
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৪ নভেম্বরঃ পরীক্ষার ফলাফল ভালো করার মহৎ উদ্দেশ্য, নাকি নিজেদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকতে পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ বলি দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র? কাছাড় জেলার কালিয়াবাজার বা কালাইন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কালাইন উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে এই মুহূর্তে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে, তাতে স্তম্ভিত সচেতন মহল।
‘মিশন ৩০’-এর নজরদারি ও ভর্ৎসনা থেকে বাঁচতে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রায় দুই শতাধিক ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রীকে মাধ্যমিক পরীক্ষার ফরম ফিলাপ থেকে বঞ্চিত করার এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, এর পাশাপাশি ফরম ফিলাপের নামে প্রতিটি পড়ুয়ার কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত ১০০ টাকা করে বলপূর্বক আদায়ের চাঞ্চল্যকর অভিযোগও জোরালো হচ্ছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এহেন পৈশাচিক উদাসীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা কালাইনের শিক্ষা জগতের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে দেখা দিয়েছে।

প্রাপ্ত চাঞ্চল্যকর অভিযোগ অনুযায়ী, কালাইন উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির তিনটি সেকশনে বর্তমানে প্রায় পাঁচ শতাধিক পড়ুয়া পড়াশোনা করছে। কিন্তু অভিযোগের তীর যেদিকে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। কিছুদিন আগে স্কুল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে ‘গার্জিয়ান মিটিং’ এর নামে অভিভাবকদের ডেকে পাঠানো হয়। অভিযোগ উঠেছে, সেই বৈঠকে উপস্থিত অভিভাবকদের নানা কৌশলে ও চতুরতার সঙ্গে ভুল বুঝিয়ে সাদা কাগজে বা রেজোলিউশনে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেই সইকে হাতিয়ার করেই ঠান্ডা মাথায় তৈরি করা হয় এক সাজানো রেজোলিউশন যেখানে দেখানো হয়েছে যে অভিভাবকরাই নাকি স্বেচ্ছায় তাঁদের সন্তানদের এবছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসাতে অনিচ্ছুক!
হাফইয়ারলিতে কম নম্বরের অজুহাতে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের চক্রান্তের অভিযোগ স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে
অথচ বাস্তবে চিত্রটা ঠিক এর উল্টো। ভুক্তভোগী ও একাংশ সচেতন অভিভাবকের সাফ দাবি, তাঁদের সন্তানরা প্রত্যেকেই পড়াশোনায় আগ্রহী এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে এবারের মেট্রিক পরীক্ষায় বসতে উদগ্রীব। কিন্তু হাফ ইয়ারলি পরীক্ষায় সামান্য কম নম্বর পাওয়ার মিথ্যে বা ভিত্তিহীন অজুহাত তুলে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্তাব্যক্তিরা বলপূর্বক বহু মেধাবী ও ইচ্ছুক পড়ুয়াকে ফরম ফিলাপ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছেন। একটিমাত্র সান্মাসিক পরীক্ষার ফলাফলকে মাপকাঠি বানিয়ে আধা-শতাধিক বা প্রায় দুই শতাধিক ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ জীবনের চাকা চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এই ফন্দি কেন? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কালাইনের প্রতিটি পাড়ায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছর কালাইন উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল অত্যন্ত শোচনীয় ও হতাশাজনক ছিল। যার সরাসরি খেসারত হিসেবে বিদ্যালয়টিকে জেলা প্রশাসনের কড়া নজরদারি তথা ‘মিশন ৩০’-এর রোষানলে পড়তে হয়েছিল। শিক্ষা মহলের জোরালো সন্দেহ, এবছর ফের সেই একই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি বা প্রশাসনের ধমক খাওয়ার আশঙ্কা থেকেই কি এই আত্মরক্ষামূলক কুৎসিত কৌশল? ফল খারাপ হতে পারে এই আশঙ্কায় আগেভাগেই ‘দুর্বল’ তকমা সেঁটে দিয়ে ইচ্ছুক পরীক্ষার্থীদের ফরম ফিলাপ আটকে দেওয়ার ছক কষেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ? ফলাফল ভালো দেখানোর এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা কি তবে কালাইনের শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ পুড়িয়ে ছাই করে দেবে?
বোর্ড নির্ধারিত ফি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফরম ফিলাপের নামে অতিরিক্ত ১০০ টাকা আদায়ের হরিলুট
অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ শুধু ফরম ফিলাপ থেকে বঞ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চরম আর্থিক লুণ্ঠন। অভিযোগ উঠেছে, যে সমস্ত দুর্ভাগা ছাত্রছাত্রীদের শেষ পর্যন্ত ফরম ফিলাপ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই বোর্ড নির্ধারিত ফি ছাড়াও অতিরিক্ত ১০০ টাকা করে বলপূর্বক আদায় করা হচ্ছে। আরও লজ্জাজনক বিষয় হলো, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বিপিএল বা দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের ফরম ফিলাপ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হওয়ার কথা থাকলেও, ছাড় পায়নি সেই গরিব পরিবারের সন্তানরাও। তাদের কাছ থেকেও ওই একশো টাকা করে জোর করে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের প্রশ্ন, বোর্ড নির্ধারিত ফির বাইরে এই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একচ্ছত্র অধিকার স্কুল কর্তৃপক্ষকে কে দিল? কোন সরকারি নির্দেশ বা গোপন অনুশাসনের ভিত্তিতে এই টাকা তোলা হচ্ছে? এর কোনো বৈধ রসিদ বা স্বচ্ছ হিসাব কি অভিভাবক বা বিদ্যালয় পরিচালন সমিতির সামনে পেশ করা হয়েছে? যদি অনুমোদনহীনভাবে এই টাকা তোলা হয়ে থাকে, তবে তা সরাসরি এক গুরুতর আর্থিক দুর্নীতি এবং সাধারণ গরিব মানুষের পকেট কাটার শামিল।
কালাইন অঞ্চলের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, একটি বিদ্যালয়ের প্রধান কাজ হলো পড়ুয়াদের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা, তাদের ত্রুটি শুধরে দিয়ে পরীক্ষার উপযুক্ত করে তোলা। কিন্তু কম নম্বর পাওয়ার অজুহাতে ফরম ফিলাপ বন্ধ করে দেওয়া মানে শিক্ষকতার মৌলিক নীতিকেই গলা টিপে হত্যা করা। এটি ছাত্রছাত্রীদের মানসিক অবসাদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং তাদের মৌলিক শিক্ষার অধিকারে সরাসরি হস্তক্ষেপ।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই ধরনের স্বেচ্ছাচারী মনোভাব চলতে থাকলে আগামী দিনে কালাইনের ছাত্রসমাজ সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়বে। অভিভাবকদের দিনের পর দিন ভুল বুঝিয়ে এই ধরনের ফন্দিফিকির বরদাস্ত করা যায় না। গোটা এই স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি প্রকাশ্যে আসার পর কাছাড়ের জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের শীর্ষ মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের গলায় ঝরে পড়েছে স্পষ্ট বিরক্তি ও কঠোর হুঙ্কার।
পরীক্ষার সুযোগ কেড়ে নেওয়ার নীতিবিরুদ্ধ এই চক্রান্ত বরদাস্ত করা হবে না, কড়া হুঁশিয়ারি শিক্ষা বিভাগের
শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তারা পরিষ্কার জানিয়েছেন, বর্তমানে দশম শ্রেণিতে পাঠরত প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর মাধ্যমিক পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করাটাই স্বাভাবিক নিয়ম। প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই পরীক্ষায় বসার সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার রয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা কিংবা অভিভাবকদের নিজস্ব লিখিত অনুরোধে যদি কেউ স্বেচ্ছায় পিছিয়ে থাকতে চান, সেটা সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। কিন্তু সান্মাসিক পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ার অজুহাতে কাউকে ফরম ফিলাপ থেকে বঞ্চিত করা শতভাগ নীতিবিরুদ্ধ ও অপরাধমূলক। এই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না, নেওয়া হবে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ।
পরীক্ষার ফলাফল ভালো করার মহৎ ব্রত যদি থাকে, তবে পড়ুয়াদের বিশেষ কোচিং বা অতিরিক্ত ক্লাসের মাধ্যমে প্রস্তুত করার পরিবর্তে তাদের পরীক্ষার মুখ থেকেই চিরতরে বঞ্চিত করার এই হীন মানসিকতা কালাইন উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে তলানিতে এনে ঠেকেছে। কার স্বার্থে, কার ইশারায় এই অন্ধ নীতি চালনা করা হচ্ছে? এই সমস্ত প্রশ্নের সদুত্তর পেতে অবিলম্বে গোটা ঘটনার উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন অভিভাবকরা। প্রতিটি বঞ্চিত ইচ্ছুক পড়ুয়ার ফরম ফিলাপের সুযোগ অবিলম্বে সুনিশ্চিত করা হোক এবং অতিরিক্ত ১০০ টাকা আদায়ের দুর্নীতির হিসাব তলব করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক, এই মুহূর্তে এটাই কালাইনের আপামর জনসাধারণের এক এবং একমাত্র জোরালো দাবি।




