এভারেস্টের মশলায় এফএসএসএআই এর লাল সংকেত!

জিভে জল আনা সুবাসের নেপথ্যে থাকা প্যাকেটজাত মশলার হাঁড়ির খবর ফাঁস করে দিয়েছে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান কর্তৃপক্ষ (এফএসএসএআই)। জনস্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অভিযোগে এবার কাঠগড়ায় দেশের অন্যতম জনপ্রিয় মশলা ব্র্যান্ড ‘এভারেস্ট’ । শুধু এভারেস্টের হিংয়ের গুণগত মান নিয়েই প্রশ্ন ওঠেনি, বরং একের পর এক মশলায় যেভাবে নিয়মভঙ্গের হিড়িক চলছে, তাতে শিউরে উঠতে হয়।

রান্নাঘরের অতি পরিচিত নাম এভারেস্ট। কিন্তু সেই বিশ্বাসের ভিতেই নাড়া দিয়েছে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (এফএসএসএআই)এর সাম্প্রতিক তদন্ত রিপোর্ট। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়া পদক্ষেপের জেরে প্রকাশ্যে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সংস্থার হিং পণ্যটির ক্ষেত্রে যেমন ভুল ও বিভ্রান্তিকর লেবেলিংয়ের প্রমাণ মিলেছে, তেমনই এর মানও নির্ধারিত কাঠামোর ধারেকাছে নেই। নিম্নমানের এই মশলা প্রতিদিন কীভাবে সাধারণ মানুষের পেটে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এভারেস্টের অন্যান্য জনপ্রিয় পণ্য যেমন এগ কারি মশলা, চিকেন মশলা এবং গরম মশলার মতো রান্নার অপরিহার্য উপাদানগুলিও খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত কঠোর নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে বিদ্ধ হয়েছে। প্রমিত মানের তোয়াক্কা না করে কীভাবে এই পণ্যগুলো বাজারে বহাল তবিয়তে বিক্রি হচ্ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে কড়া নোটিস পাঠিয়েছে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (এফএসএসএআই)।

জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে প্রস্তুতকারক সংস্থাকে। একইসঙ্গে, কথিত নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে ‘লালজি গোধূ অ্যান্ড কোম্পানিকেও আলাদাভাবে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। যাঁরা ভাবছেন প্যাকেটবন্দি মশলা মানেই বিশুদ্ধতা এবং পরিচ্ছন্নতা, তাঁদের এই ঘটনা বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। মুনাফার লোভে মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে এই হেলাফেলা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

এই লাগামছাড়া অনিয়মের বাজারে ভোক্তাদের সচেতন করতে এক যুগান্তকারী কিন্তু অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপের পথে হাঁটছে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (এফএসএসএআই)। প্যাকেটজাত প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্ষেত্রে এবার একটি নতুন ‘ফ্রন্ট-অফ-প্যাক’ সতর্কতামূলক লেবেল চালুর জোরালো প্রস্তাব আনা হয়েছে। এই প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এবার থেকে যেকোনো প্যাকেটজাত খাবারের ঠিক সামনের দিকে একটি উজ্জ্বল লাল রঙের ষড়ভুজাকৃতির চিহ্ন থাকা বাধ্যতামূলক হতে পারে।

এই লাল চিহ্নের মূল উদ্দেশ্য হলো ক্রেতাদের সরাসরি সতর্ক করা। কোনো খাদ্যে যদি অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি, লবণ কিংবা স্যাচুরেটেড ফ্যাট (থাকে, তবে তা এই বিশেষ চিহ্নের মাধ্যমে চোখের পলকে ধরা পড়বে। অর্থাৎ, সুপারমার্কেটের তাকে বা মুদির দোকানে দাঁড়িয়ে আর পাড়ার ফর্সা বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিতে হবে না। প্যাকেটের গায়ে ওই লাল ষড়ভুজ দেখলেই ক্রেতা বুঝতে পারবেন যে এই খাবারটি তাঁর রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের ঝুঁকি কতটা বাড়িয়ে দিতে পারে।

তবে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (এফএসএসএআই) এর এই জনহিতকর পদক্ষেপেও বাধ সাধার চেষ্টা চালাচ্ছে পুঁজিপতি শিল্পমহল। প্রস্তাবিত এই কঠোর লেবেলিং ব্যবস্থা নিয়ে ইতোমধ্যে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে দেশের খাদ্যশিল্পের বড় বড় মহারথীরা।

কোকা-কোলা, নেসলে এবং পেপসিকোর মতো বহুজাতিক দানবদের প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী এই নতুন ব্যবস্থার একাধিক দিক নিয়ে আপত্তি তুলেছে। তাদের দাবি, এই ধরণের সতর্কবার্তা ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রশ্ন উঠছে, ব্যবসায়িক মুনাফা বড়, নাকি সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য বড়?

এই প্রসঙ্গে মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের কমিশনার তুকারাম মুন্ধে অত্যন্ত কড়া ও বাস্তবসম্মত বার্তা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, খাদ্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি বা সংস্থাগুলির দায়িত্ব কেবল আইনি নিয়মের বেড়াজালে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আইন মানার পাশাপাশি প্রতিটি খাদ্যপণ্যের পরম নিরাপত্তা এবং সর্বোচ্চ গুণগত মান সুনিশ্চিত করা তাদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।

রান্নাঘর আজ আর নিরাপদ দুর্গ নয়, বরং এক অদৃশ্য রাসায়নিক যুদ্ধের ময়দান। প্যাকেটজাত মশলার মোড়কে মোড়া ভেজাল আর কর্পোরেট প্রলোভনের বিরুদ্ধে যদি এখনই সাধারণ মানুষ ও প্রশাসন সোচ্চার না হয়, তবে আমাদের আগামী প্রজন্ম এক গুরুতর স্বাস্থ্য সংকটের দিকে এগোচ্ছে, এ কথা বলাই বাহুল্য।

Related Posts

সত্য এক, মানবতাও এক,  নিউইয়র্কে এক বিশ্ব, এক মানবতার মঞ্চ থেকে বিশ্ববাসীকে ঐক্যের বার্তা দিলেন মোহন ভাগবত

হিন্দুত্বের অর্থ মুসলিমদের বাদ দেওয়া নয়, নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে বার্তা মোহন ভাগবতের বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩১ আগষ্টঃ “ধর্ম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানবতা এক। সত্য একটাই, আর সেই সত্যেরই অবধারিত ফল…

বিকশিত ভারতের স্বপ্নে ঘোর অনিশ্চয়তা ও নৈরাশ্যের আঁধারে তলিয়ে যাচ্ছে  তরুণদের ভবিষ্যৎ

৩৭ কোটি জেন জির এক-চতুর্থাংশই কাজহীন, শিক্ষাহীন ও প্রশিক্ষণহীন নীতি আয়োগের রিপোর্টে বিস্ফোরক তথ্য বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩১ আগষ্টঃ ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী এক তরুণ ও উদীয়মান ভারতের উজ্জ্বল…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *