অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি ও প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত থাকার অভিযোগে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ জুলাইঃ যে হাসপাতাল মানুষের জীবন রক্ষার শেষ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা, সেই হাসপাতালই যদি অব্যবস্থা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং ন্যূনতম পরিষেবার ঘাটতিতে জর্জরিত হয়ে পড়ে, তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ মানুষ। কাছাড় জেলার বড়খলা প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের একের পর এক অভিযোগ সেই উদ্বেগজনক বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।
হাসপাতালের পরিকাঠামো, পরিচ্ছন্নতা, রোগী পরিষেবা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যা থাকলেও সেগুলির কার্যকর সমাধানে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান, জবাবদিহি এবং কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতাল চত্বরে পরিচ্ছন্নতার চরম অভাব রয়েছে। ওয়ার্ড, বারান্দা, শৌচাগার এবং হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না হওয়ায় দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি এলাকাবাসীর। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সুস্থ হওয়ার আশায় হাসপাতালে এলেও পরিবেশ দেখে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। স্থানীয়দের কথায়, এ যেন হাসপাতাল নয়, রোগের আঁতুড়ঘর।
এর পাশাপাশি আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে চিকিৎসা পরিষেবা নিয়েও। স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসকের পরিবর্তে ফার্মাসিস্ট রোগী পরীক্ষা করে ওষুধ লিখে দিচ্ছেন বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরামর্শ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা যায়নি, তবুও এলাকাবাসীর দাবি, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই চলছে এবং বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোনও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
অভিযোগ আরও রয়েছে যে, সরকারি দায়িত্ব পালনের চেয়ে কিছু চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্ট ব্যক্তিগত চেম্বার বা প্রাইভেট প্র্যাকটিসে বেশি সময় দিচ্ছেন। ফলে সরকারি হাসপাতালে নির্ধারিত সময়ে রোগীরা চিকিৎসকের দেখা পান না। বহু রোগী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চিকিৎসা না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন। স্থানীয়দের দাবি, শুধুমাত্র জরুরি পরিস্থিতি বা বিশেষ প্রয়োজনে চিকিৎসকদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, বড়খলা প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল প্রায় ৪০টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। তাই সরকারি এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রই তাঁদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই কেন্দ্রের পরিষেবা নিয়ে যদি এত প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু চিকিৎসক সংকট নয়, হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায়ও একাধিক ত্রুটি রয়েছে। নিয়মিত নজরদারির অভাব, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণেই পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না বলে তাঁদের দাবি। স্বাস্থ্য পরিষেবা কোনও বিলাসিতা নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। তাই বড়খলা প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি হাসপাতালের পরিষেবা, পরিচ্ছন্নতা এবং চিকিৎসক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, অভিযোগের কোনও অংশ ভিত্তিহীন হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে জনসমক্ষে স্পষ্ট করা উচিত।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দ্রুত বড়খলা প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিদর্শন করে বাস্তব পরিস্থিতির নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করবে এবং দীর্ঘদিনের সমস্যা ও অনিয়ম দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। পাশাপাশি হাসপাতালটিকে একটি পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল, আধুনিক ও জনবান্ধব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পরিষেবার মানোন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাঁদের মতে, একটি সরকারি হাসপাতাল শুধু চিকিৎসাসেবা দেওয়ার স্থান নয়, সাধারণ মানুষের জীবনের শেষ ভরসাস্থল। তাই সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অটুট রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, একটি সরকারি হাসপাতালের প্রতি জনসাধারণের আস্থা নষ্ট হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সমগ্র জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর।






