স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্যের বিরুদ্ধে কাটমানি ও নাম কাটার গুরুতর অভিযোগে বিতর্ক তুঙ্গে
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩১ আগষ্টঃ উন্নয়নের জোয়ারে গা ভাসানোর সরকারি প্রতিশ্রুতি এবং গরিব মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে নানান জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ঢক্কানিনাদ যখন চতুর্দিকে মুখরিত, ঠিক তখনই বাস্তব চিত্রটা অনেক ক্ষেত্রেই বড় বেশি নির্মম ও নিষ্ঠুর। কাগুজে বাঘের মতো সরকারি তালিকা আর আমলাতান্ত্রিক লালফিতের ফাঁসে জর্জরিত হয়ে গরিব মানুষের স্বপ্ন কীভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে চড়ে পড়ে, তার এক জলজ্যান্ত ও মর্মান্তিক উদাহরণ সামনে এল কাছাড় জেলার কাটাখাল বা ভাগা বাজার জিপির অধীনস্থ জয়ধনপুর গ্রাম থেকে।
সরকারি আবাসের তালিকায় নাম আসার পর সমস্ত নথিপত্র সশরীরে জমা দেওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ আট মাস পেরিয়ে গেলেও ভাগ্যের বরকত বা সরকারি মাথার ছাদ জুটল না এক অসহায় ও নিদারুণ কষ্টসঙ্কুল পরিবারের ভাগ্যে। আর এই পুরো ঘটনার নেপথ্যে স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্যের চরম দুর্নীতি, খামখেয়ালিপনা ও স্বজনপোষণের গুরুতর অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
সংবাদমাধ্যমের কাছে ক্ষোভ উগরে দিয়ে ভাগা বাজার জিপির জয়ধনপুর গ্রামের বাসিন্দা বাবুল হুসেন মাজরভুঁইয়া এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ টানাপোড়েন ও লড়াইয়ের পর সরকারি আবাস যোজনা বা প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনার তালিকায় তাঁর স্ত্রী সামসোনা বেগম লস্করের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
এই খবর পাওয়ার পর স্বভাবতই আশার আলো দেখতে পেয়েছিলেন দিনমজুর বা প্রান্তিক এই পরিবারের মানুষগুলো। সরকারের নির্দেশমতো আবাস ঘরের জন্য যা যা প্রয়োজনীয় নথিপত্র যেমন আধার কার্ড, জব কার্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত কাগজ থেকে শুরু করে যাবতীয় দস্তাবেজ সবকিছুই অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নির্দিষ্ট জায়গায় জমা দেন তাঁরা।
সমস্ত দস্তাবেজ জমা দেওয়ার পরও কার ইশারায় নাম বাদ গেল, তা নিয়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থার জোরালো দাবি।
কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস কিংবা প্রশাসনিক উদাসীনতা, নথি জমা দেওয়ার পর একে একে আটটি দীর্ঘ মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও তাঁদের উঠোনে ইটের গাঁথনি কিংবা ছাদ ঢালাইয়ের কোনো সাড়াশব্দই মেলেনি। সরকারের দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে জুতোয় তলা ক্ষয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও মেলেনি কোনো সদুত্তর। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগের তির মূলত স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য মুসলিম উদ্দিনের দিকে।
দীর্ঘ আট মাস ধরে ঘরের কোনো খোঁজখবর না মেলায় যখন বাবুল হুসেন স্থানীয় মেম্বার মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চান যে তাঁদের ঘরের বরাদ্দ কেন আটকে রয়েছে, তখন তাঁর সামনে এক আকস্মিক ও বিস্ফোরক তথ্য এসে হাজির হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মেম্বার সাহেব নাকি তাঁকে সাফ জানিয়ে দেন যে, সামসোনা বেগম লস্করের নাম সরকারি ঘরের সেই চূড়ান্ত তালিকা থেকে রহস্যজনকভাবে ‘কেটে’ বা বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যাঁদের দিন কাটে দিন আনা দিন খাওয়ার লড়াইয়ে, সেই গরিব পরিবারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে এই কথা শুনে। বাবুল হুসেনের সরল প্রশ্ন, যদি সরকারি আবাস প্রকল্পের প্রাথমিক তালিকায় নাম থাকার পর সমস্ত আইনি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাসময়ে জমা দেওয়া হয়ে থাকে, তবে পরবর্তীতে কোন জাদুমন্ত্রে ও কার স্বার্থে সেই নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেল? আর যদি কোনো প্রশাসনিক বা অভ্যন্তরীণ কারণে নাম বাদ পড়েই থাকে, তবে তার নেপথ্যের আসল কারণ কী?
এই নিয়ে পঞ্চায়েত সদস্য বা সংশ্লিষ্ট মহলের পক্ষ থেকে আজ পর্যন্ত পরিবারটিকে কোনো সন্তোষজনক বা স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। শুধু সরকারি ঘর নয়, অভাব আর বঞ্চনা যেন এই পরিবারের নিত্যসঙ্গী। বর্তমানে বাবুল হুসেন ও তাঁর স্ত্রী সামসোনা বেগম তাঁদের অবুঝ সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে একটি জীর্ণশীর্ণ, ঝুপড়ি ও ভাঙাচোরা কুঁড়েঘরে দিন কাটাচ্ছেন। সামান্য বৃষ্টি হলেই যে ঘরে জল পড়ে, কালবৈশাখীর ঝড়ে মাথার ওপরের টিন উড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়,এমন একটি বিপজ্জনক ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই চলছে তাদের শৈশব ও জীবনসংগ্রাম।
ভুক্তভোগী পরিবারের গুরুতর অভিযোগ, শুধু আবাস যোজনা বা সরকারি ঘর থেকেই নয়; বর্তমান রাজ্য সরকারের বহুচর্চিত ও জনপ্রিয় ‘অরুণোদয়’ প্রকল্প কিংবা অন্যান্য গরিব কল্যাণমূলক সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকেও তাঁদের পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। সমাজের একেবারে প্রান্তিক স্তরের এই মানুষগুলোর কপালে কেন সরকারি দয়ার সামান্য বিন্দুটিও জুটছে না, তা নিয়ে এখন গোটা এলাকা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
যেখানে দেশের গরিব মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং প্রতিটি গৃহহীন পরিবারকে মাথার উপর ছাদ দিতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করছে, ঠিক সেখানে তৃণমূল স্তরে কিছু জনপ্রতিনিধি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দুর্নীতির কারণে কীভাবে সেই প্রকল্পের সুফল আটকে যাচ্ছে, তা জয়ধনপুর গ্রামের এই ঘটনায় ফের একবার বেআব্রু হয়ে পড়ল।
সরকারি প্রকল্পের সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার নামে বা তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার নেপথ্যে কোনো আর্থিক লেনদেন বা কাটমানি চক্র কাজ করছে কি না, তা নিয়েও এখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন সচেতন মহল। এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পঞ্চায়েত সদস্য মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো স্পষ্ট বা সন্তোষজনক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, মেম্বারের বা তাঁর সহযোগীদের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো বক্তব্য বা সাফাই পাওয়া গেলে তা সংবাদমাধ্যমের পাতায় গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হবে।
এদিকে, এই গোটা কেলেঙ্কারির পেছনে প্রকৃত সত্য কী লুকিয়ে রয়েছে, তা উদ্ঘাটন করতে এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা বণ্টন প্রক্রিয়ায় হওয়া এই জালিয়াতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবিলম্বে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ দপ্তরের হস্তক্ষেপ দাবি করেছে ক্ষুব্ধ পরিবার। গরিব মানুষের হক ছিনিয়ে নেওয়ার এই কলঙ্কিত চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রশাসন কবে কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং ভুক্তভোগী পরিবারটি তাদের নায্য অধিকার ফিরে পায় কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।






