সার্টিফিকেট জালিয়াতির রমরমা বাজারে শিলচরের সচেতন ভোটারদের মুকুটে যুক্ত হলো লজ্জার নতুন পালক
ড. নিখিল দাশ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১০ অক্টোবরঃ ভাষার জন্য রক্তদান ও সংস্কৃতির উর্বর ভূমি, পন্ডিত-মনীষীদের জন্মস্থান বরাক উপত্যকার প্রধান প্রাণকেন্দ্র এই শিলচর শহর। যে শহরকে একসময়ে এ অঞ্চলের ‘শিক্ষার রাজধানী’ বা সাংস্কৃতিক শহর বলে গর্ব করতেন প্রবীণ নাগরিকরা, সেই শিলচরের মুকুটে যুক্ত হলো এক অনবদ্য ও লজ্জাজনক পালক! সদ্য সমাপ্ত পুর নিগম নির্বাচনে জয়ী হওয়া জনপ্রতিনিধিদের একাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতার খতিয়ান নিয়ে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে, তাতে শিলচরের তথাকথিত ‘সচেতন ও শিক্ষিত’ সমাজের কপালে কেবল চিন্তার ভাঁজই পড়েনি, বরং সমগ্র শহরজুড়ে শুরু হয়েছে এক তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ও সমালোচনার ঝড়।
ভোটারদের দয়ায় রাতারাতি ডিগ্রি বদল, জাল সার্টিফিকেটের রমরমা বাজার এবং গণতন্ত্রের পবিত্র মন্দিরে এক অদ্ভুত অসততার জয়জয়কার সব মিলিয়ে শিলচরবাসীর আধুনিক রাজনৈতিক সচেতনতা এখন এক বিশাল প্রশ্নচিহ্নের মুখে। পুর নিগম নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর যখন জয়ী প্রার্থীদের শংসাপত্র ও তাঁদের জমা দেওয়া হলফনামাগুলি খুঁটিয়ে দেখা শুরু হলো, তখনই বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনে জয়লাভ করা কাউন্সিলরদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে রয়েছে জালী বা ভুঁয়ো ডিগ্রি ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ। দীর্ঘদিন ধরে নামসর্বস্ব ও স্বীকৃতিহীন প্রতিষ্ঠান থেকে আনা ভুয়ো শংসাপত্রকে হাতিয়ার করেই তাঁরা ময়দানে নেমেছিলেন।
যোগ্যতা ও সততার বালাই নেই, দলের হাওয়ায় গা ভাসিয়ে সার্টিফিকেট ফুঁড়ে সোজা কাউন্সিলর!
আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, নির্বাচনের আগে যাঁদের নামের পাশে শিক্ষার লেশমাত্র ছিল না বা যাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে জনমানসে প্রশ্ন ছিল, ভোটের বৈতরণী পার হয়ে বিজয়ের তিলক পরতেই তাঁরা যেন রাতারাতি ‘গ্র্যাজুয়েট’ বা উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছেন! ভোটারদের মূল্যবান ভোট আর অন্ধ সমর্থনের জাদুকরী ছোঁয়ায় জালী ডিগ্রির কালি ঢাকা পড়ে তৈরি হয়েছে এক নতুন ‘শিক্ষিত’ জনপ্রতিনিধির দল। এ যেন গণতন্ত্রের মঞ্চে এক মায়াবী রূপকথা যেখানে রাতারাতি অশিক্ষিত কিংবা সন্দেহজনক যোগ্যতার প্রার্থীরাও ডিগ্রিধারী হতে পারেন!
রাজনীতিতে শিক্ষা বা যোগ্যতাই যে একমাত্র মাপকাঠি নয়, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু শিলচরের এই পৌর নির্বাচনে যা ঘটেছে, তা রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও নৈতিকতার সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। অভিযোগ উঠছে, ভোটের মাঠে নামার আগে প্রার্থীরা তাঁদের মনোনয়নপত্রে যে সমস্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার বিবরণ দিয়েছেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ধোঁয়াশা থাকলেও রাজনৈতিক দলের ছাতার নিচে থাকায় তা নিয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পাননি। কিন্তু নির্বাচন বৈতরণী পার হওয়ার পরই যখন সেই ডিগ্রিগুলির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, তখন দেখা যায়, কাগজ-কলমে যাঁরা এতদিন স্কুল বা কলেজের গণ্ডি পার হতে পারেননি, তাঁরাও হঠাৎ করে সমাজের চোখে ‘শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী’তে পরিণত হয়েছেন!
প্রশ্ন উঠছে, এই অলৌকিক ডিগ্রি বদলের নেপথ্য কারিগর কে? প্রশাসন, নাকি রাজনৈতিক দলগুলির অন্ধ ও বেপরোয়া প্রার্থী মনোনয়ন নীতি? দলীয় স্বার্থে যখন অপরাধ বা জালিয়াতিকে ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়, তখন সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেবল একটি তামাশায় পর্যবসিত হয়। শিলচরের এই নির্বাচন যেন সেই নির্মম সত্যেরই এক জীবন্ত দলিল।
প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে শিলচরের সেই সমস্ত তথাকথিত ‘সচেতন ও শিক্ষিত’ ভোটারদের বিবেককে নিয়ে, যাঁরা নিজেদের বুক ফুলিয়ে সভ্য ও মার্জিত বলে দাবি করেন। শহরের বুদ্ধিজীবী মহল থেকে শুরু করে সাধারণ চা-শহরের চায়ের কাপের আড্ডা সব জায়গাতেই এখন একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে, আমরা কি তবে এভাবেই হাতেনাতে অসততাকে প্রশ্রয় দিচ্ছি?
ভোটারদের এই অন্ধ দলান্ধতা এবং প্রার্থীর যোগ্যতা ও সততা যাচাই না করে শুধু দলের রঙ দেখে বা ফাঁকা প্রতিশ্রুতিতে ভোট দেওয়ার মানসিকতাই আজ শিলচরের কপালে এই দুর্ভাগ্যের তিলক এঁকে দিয়েছে। সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, যে শহরের ঘরে ঘরে এত স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষিত যুবক-যুবতীরা বেকারত্বের জ্বালায় ধুঁকছেন, সেই শহরেই কিনা সার্টিফিকেট জালিয়াতির মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত প্রার্থীরা পৌরনিগমের মাথা হয়ে শহরের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন? এই জয় কি সত্যিই গণতন্ত্রের জয়, নাকি শিলচরের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মুখে এক বিরাট চপেটাঘাত?
শিলচরের সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকরা এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, পুর নিগমের মতো একটি স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় যেখানে শহরের নিকাশি ব্যবস্থা, পানীয় জল, জঞ্জাল সাফাই এবং সার্বিক উন্নয়নের মতো অতি সংবেদনশীল বিষয়গুলি জড়িত, সেখানে যদি শুরুতেই অসততা ও জালিয়াতির বুনিয়াদ থাকে, তবে সেই বোর্ডের কাছে নাগরিক পরিষেবার উন্নতি আশা করা দিবাস্বপ্ন মাত্র।
যাঁরা আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে জনপ্রতিনিধি হওয়ার সিঁড়ি বেয়েছেন, তাঁরা আগামী দিনে শহরের সার্বিক কল্যাণে কতটা সততা বজায় রাখবেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে কাটাছেঁড়া। কিন্তু সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই জালিয়াতি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও রাজনৈতিক দলগুলির নির্লজ্জ নীরবতা এবং ভোটারদের একাংশের নির্বিকার মনোভাব। যে সমাজ অপরাধ বা জালিয়াতিকে প্রশ্ন না করে উল্টে তাকে প্রশ্রয় দেয়, সেই সমাজের পতন অনিবার্য।
শিলচরের অলিগলিতে এখন একটাই স্যাটায়ার বা শ্লেষাত্মক মন্তব্য কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, “খুশ রহো শিলচরিয়ান!” যে শহর একদিন মেধা ও সততার জন্য গর্ব করত, আজ সেই শহরই বোধহয় জালিয়াতির মুকুট পরে উৎসবের আমেজে মেতে উঠেছে। জাল ডিগ্রিকে সিঁড়ি করে যাঁরা ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছেছেন, তাঁরা হয়তো সাময়িক স্বস্তি পেয়েছেন, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে শিলচরের যে নৈতিক পতন ঘটল, তার দায় কে নেবে?
সার্টিফিকেট জালিয়াতির এই কাল সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিয়ে আগামী প্রজন্মকে আমরা কী বার্তা দিচ্ছি? সময় এসেছে আয়নার সামনে দাঁড়ানোর। শিলচরের ‘সচেতন’ ভোটাররা যদি এবারও অন্ধের মতো চোখ বুজে থাকেন, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই শহুরে গণতন্ত্রের কাঠামো যে পুরোপুরি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। আজ যদি এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় না ওঠে, তবে আগামীর ইতিহাস শিলচরের এই প্রজন্মকে ক্ষমা করবে না।





