অপশক্তির দোহাই দিয়ে উত্তর গোপালপুরে শিশু হত্যা? চাঞ্চল্যকর ঘটনায় চিরুনি তল্লাশিতে শীর্ষ পুলিশ প্রশাসন
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ আগষ্টঃ কচি গলার আধো-আধো কান্না কিংবা একটুকরো নিষ্পাপ হাসি নিয়ে যে ঘরে আনন্দ উপচে পড়ার কথা ছিল, ১২ দিন যেতে না যেতেই সেই ঘরে এখন শ্মশানের নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতাকে ছাপিয়ে এখন চারপাশে ভাসছে একগুচ্ছ প্রশ্ন, আর এক রহস্যময় চাঞ্চল্য। কুয়োর হিমশীতল জল থেকে উদ্ধার হলো মাত্র ১২ দিনের এক ফুটফুটে কন্যাশিশুর নিথর দেহ। ঘটনাকে ঘিরে তীব্র ক্ষোভ, শোক এবং ঘনীভূত রহস্যে উত্তাল পাথারকান্দির রাধাপ্যারী জিপির উত্তর গোপালপুর গ্রাম।
ঘটনার সূত্রপাত শনিবার গভীর রাতে। শিশুটির পিতা অরুণ দাসের বয়ান অনুযায়ী, রাত তখন আনুমানিক ৩টা। আচমকাই তাঁর স্ত্রী চিৎকার ও কান্নাকাটি শুরু করেন। ঘুম ভেঙে উঠে অরুণবাবু যা শোনেন, তা শুনে তাজ্জব বনে যান স্থানীয়রা সহ পুলিশ প্রশাসনও। শিশুটির মায়ের অদ্ভুত দাবি, মাঝরাতে নাকি এক অপরিচিতা মহিলা ঘরে ঢুকে শিশুটিকে নিজের সন্তান বলে দাবি করে!
শুধু তাই নয়, মায়ের কোল থেকে জোরপূর্বক কচি প্রাণটিকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়া হয় পাশের কুয়োয়। এখানেই শেষ নয়, পরবর্তীকালে মায়ের মুখে উঠে আসে আরও এক রোমহর্ষক তত্ত্ব। তাঁর দাবি, কোনো সাধারণ মানুষ নয়, বরং কোনো অপশক্তি বা ভূত-প্রেতের কবলে পড়েছিলেন তিনি! আর সেই অদৃশ্য শক্তিই নাকি তাঁর ১২ দিনের কন্যাসন্তান সুস্মিতা দাসকে কেড়ে নিয়ে কুয়োর জলে বিসর্জন দিয়েছে।
আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে, আরজি কর থেকে শুরু করে রাজ্যের নানা প্রান্তে যখন নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে তপ্ত পরিবেশ, তখন গভীর রাতে ঘরে ঢুকে শিশুকন্যাকে কুয়োয় ফেলে দেওয়ার এই গল্প কতটা বিশ্বাসযোগ্য? স্থানীয় সচেতন মহলের একাংশের মতে, এই দাবি কেবল অবিশ্বাস্যই নয়, বরং তদন্তের গতিপথ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার এক কুটিল প্রয়াস হতে পারে।
রাত ৩টের সময় ঘরের দরজা টপকে এক অপরিচিতা নারী কীভাবে নিঃশব্দে ঢুকে শিশু ছিনিয়ে নিল? কোনো ধস্তাধস্তি বা তৎক্ষণাৎ চিৎকার কেন ঘরের বা প্রতিবেশীদের কানে গেল না? দুঃখজনক হলেও সত্যি, সমাজের একাংশে এখনও কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়াকে অভিশাপ মনে করা হয়। শিশুটি কি কোনো পারিবারিক অন্ধবিশ্বাস, মানসিক অসুস্থতা (যেমন পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন), নাকি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের নির্মম শিকার? কুসংস্কারকে ঢাল বানিয়ে নিজের অপরাধ ঢাকা বা মূল ঘটনা গোপন করার চেষ্টা এর আগেও বহুবার দেখা গেছে। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, গল্পে একাধিক অসংগতি রয়েছে।
ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই বাজারিছড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খনিন্দ্র নাথ বিশাল বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পৌঁছান। কুয়ো থেকে সুস্মিতার নিথর, শীতল দেহটি উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন পাথারকান্দি চক্র আধিকারিক এবং সমজেলা পুলিশ সুপার। ঘটনাটির সংবেদনশীলতা বিচার করে প্রশাসনিক তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় শিশুটির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলেই স্পষ্ট হবে শিশুকন্যাটিকে কুয়োয় ফেলার আগে কোনো শারীরিক নির্যাতন বা শ্বাসরোধ করা হয়েছিল কি না।
একটি ১২ দিনের অবোধ শিশুর এই নির্মম পরিণতিতে গোটা উত্তর গোপালপুর গ্রামে শোকের সাথে সাথে জন্ম নিয়েছে চরম ক্ষোভ। গ্রামবাসীর স্পষ্ট কথা, ভৌতিক গল্প দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। এই হত্যার পেছনে যার বা যাদেরই হাত থাকুক না কেন, তাদের কঠোরতম শাস্তি হতেই হবে। পুলিশ ইতিমধ্যেই শিশুটির পিতা-মাতা সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।
মায়ের মানসিক অবস্থা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি, ঘটনাটি নিছক পারিপার্শ্বিক ষড়যন্ত্র নাকি এর পেছনে কোনো পারিবারিক অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এক অনাবিল ফুটফুটে জীবনের আলো ফোটার আগেই নিভে গেল গোপালপুরের কুয়োর কালো জলে। এখন দেখার, পুলিশি তদন্তে কি সত্য উঠে আসে নাকি অপশক্তির আড়ালেই চাপা পড়ে থাকবে সুস্মিতার করুণ আর্তি? গোটা সীমান্ত শহর এখন তাকিয়ে রয়েছে তদন্তের দিকে।





