বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ টানা প্রবল বৃষ্টিতে ফের বিপর্যস্ত অসমের রাজধানী গুয়াহাটি। মঙ্গলবার ভোর থেকে অবিরাম বৃষ্টির জেরে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে কৃত্রিম বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই মঠঘরিয়া এলাকায় ভূমিধসে একটি বাড়ি চাপা পড়ে একই পরিবারের তিন সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। ঘটনায় আরও এক সদস্য ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়লেও তাঁকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, মৃতদের নাম নাগেন রাজবংশী, মীনা রাজবংশী এবং চুনু রাজবংশী। নিহতদের মধ্যে পরিবারের এক কন্যাসন্তানও রয়েছে। প্রবল বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি মাটি ধসে বাড়িটির ওপর পড়লে এই দুর্ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারের কাজ শুরু করেন। পরিবারের ছেলেটিকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
এই দুর্ঘটনার পর গুয়াহাটির পাহাড়ি ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকাগুলিতে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। লাগাতার বৃষ্টির কারণে নরম হয়ে যাওয়া মাটি আরও ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতা অবলম্বনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এদিকে টানা বৃষ্টিতে শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। নারেঙ্গি-সিক্স মাইল ভিআইপি রোডের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বরবাড়ি থেকে সিক্স মাইল পর্যন্ত বেশ কয়েকটি অংশে হাঁটুসমান জল জমে যাওয়ায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সাধারণ মানুষকে জল পেরিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
চাঁদমারি এলাকাতেও রাস্তা ও ফুটপাথে জল ঢুকে পড়েছে। ফলে পথচারী ও যানবাহন চালকদের চরম দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়েছে। পাঞ্জাবাড়ি, বেলতলা সার্ভে-সহ শহরের অন্যান্য এলাকাতেও ব্যাপক জলাবদ্ধতার খবর পাওয়া গেছে। অনেক জায়গায় যানবাহনের গতি অত্যন্ত ধীর হয়ে পড়েছে।
এদিকে অসম সরকার বন্যাকবলিত পরিবারগুলির জন্য আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, শিবসাগর, চরাইদেও এবং যোরহাট জেলার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ হাজার টাকা করে অন্তর্বর্তী বন্যা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী,
বর্তমানে ১৬,৭৪৬টি পরিবার এই সহায়তার আওতায় রয়েছে। তাদের জন্য মোট ২৫ কোটি ১২ লক্ষ টাকা সরাসরি হস্তান্তর করা হবে। সামগ্রিকভাবে এখনও পর্যন্ত ১ লক্ষ ১৭ হাজার ৯৫টি পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার জন্য মোট ১৭৫ কোটি ৬৪ লক্ষ টাকা ছাড়া হয়েছে।
বন্যার পাশাপাশি রাজ্য সরকার দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও একাধিক উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছে। মুখ্যমন্ত্রীর বিদেশি ভাষা শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রত্যেক নির্বাচিত প্রার্থীকে প্রশিক্ষণ সহায়তা হিসেবে এক লক্ষ টাকা করে তিনটি কিস্তিতে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রশিক্ষণ শেষে চাকরি পাওয়ার পর আরও ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হবে। এই কর্মসূচিতে এখনও পর্যন্ত ২ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা অনুমোদন করা হয়েছে। ২০২৩-২৬ সময়কালে ১৪৮ জন প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি হয়েছেন এবং ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে নতুন করে ৪৫২ জন ভর্তি হয়েছেন।
নবীন স্নাতকদের আর্থিক সহায়তা দিতে মুখ্যমন্ত্রীর ‘জীবন প্রেরণা’ প্রকল্পও চালু করা হয়েছে। সরকারি ও জনসাধারণের প্রতিষ্ঠান থেকে সদ্য স্নাতক হওয়া যোগ্য প্রার্থীরা এই প্রকল্পের আওতায় প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করে নয় মাস পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পাবেন। সরকারি হিসাবে, মোট ৪৮,১৮৮ জন প্রার্থীকে এই প্রকল্পের জন্য যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১১৮ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা।
একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা, অন্যদিকে দক্ষতা উন্নয়ন ও নবীন প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এই দুই দিককে সামনে রেখে রাজ্য সরকার একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তবে গুয়াহাটিতে লাগাতার বৃষ্টির জেরে ভূমিধস ও জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।






