কাগজে-কলমে কোটি টাকার ‘গুণোৎসব’, বাস্তবে ভাড়ার ভাঙা ঘরে পঁচিশজন ছাত্রের ভবিষ্যৎ!

কচিকাঁচা শিশুদের জন্য নেই কোনো স্থায়ী পাঠশালা, নেই কোনো আধুনিক শিক্ষা পরিকাঠামো। অন্যের দয়ায় চলা একটি সংস্থাসংলগ্ন জরাজীর্ণ ভবনে এখন চলছে সরকারি এই বিদ্যাশ্রমের দৈনন্দিন কার্যক্রম। অনুসন্ধানে জানা গেছে, লক্ষীপুরের মারখুলিনে অবস্থিত একটি পুরানো আনারস ফ্যাক্টরির অত্যন্ত ভগ্নপ্রায় ঘরে বর্তমানে খুদে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে। ঘরটি মূলত ‘মার স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন’-এর কার্যালয়।

সেই ক্লাবের অতি সংকীর্ণ ও আলো-বাতাসহীন তিনটি ছোট ছোট কোঠায় পঁচিশ জন ছাত্র-ছাত্রীকে কোনোমতে গাদাগাদি করে বসিয়ে পড়ানো হচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমের পাশাপাশি ওই অ্যাসোসিয়েশনের অফিস রুমটিকেই ব্যবহার করতে হচ্ছে স্কুলের দাপ্তরিক কাজ বা ‘অফিস’ হিসেবে। অর্থাৎ, শিক্ষা দপ্তরের খাতায় এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিদ্যালয় হলেও বাস্তবে এটি একটি ক্লাবের তিন কামরার মেসঘর মাত্র!

স্কুলটির অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি যেন এক নিরন্তর বাস্তুচ্যুতির গল্প, স্কুলের এই তীব্র সংকটের দিনে ২০২১ সালের আগস্ট মাসে এক দৃষ্টান্তমূলক মহত উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধান শিক্ষক লাল সাংলুর মার। তিনি নিজের পৈতৃক ৩ বিঘা জমি বিদ্যালয়ের নামে দান করে দেন।

সেখানে বাঁশ ও টিন দিয়ে একটি অস্থায়ী ঘর তৈরি করে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি; প্রবল এক কালবৈশাখী ঝড়ে সেই বাঁশের অস্থায়ী ঘর পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এরপর তৎকালীন ব্লক প্রাথমিক শিক্ষা আধিকারিক লালনপুই তোলরের হস্তক্ষেপে সাময়িকভাবে স্কুলটিকে স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ঘরে নিয়ে আসা হয়, যা আজও স্থায়ী রূপ পায়নি।

বর্তমানে এই স্কুলে প্রধান শিক্ষক মার্ক খজল ছাড়া রয়েছেন দুজন সহকারী শিক্ষক এবং একজন মাল্টি-টাস্ক ওয়ার্কার । অর্থাৎ চারজন সরকারি কর্মচারীর কর্মসংস্থান এই স্কুলে রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি এক সামাজিক পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় এক চরম বিস্ময়কর দৃশ্য, পুরো স্কুলে মাত্র একজন ছাত্র উপস্থিত! স্কুলের এমন বেহাল দশা ও উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে বর্তমান প্রধান শিক্ষক মার্ক খজল জানান,

পরিদর্শন বা সরেজমিন অনুসন্ধানের সময়টি ছিল স্কুলের ‘টিফিন টাইম’ বা মধ্যাহ্নভোজনের বিরতি। ফলে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই দুপুরের খাবার খেতে নিজ নিজ বাড়িতে চলে গিয়েছিল। তবে স্থানীদের দাবি, উপযুক্ত পরিকাঠামো ও শ্রেণীকক্ষের অভাবে অভিভাবকরা সন্তানদের এই স্কুলে পাঠাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্যটি দিয়েছেন বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক মার্ক খজল নিজেই। লাল সাংলুর মার-য়ের দান করা সেই অমূল্য ৩ বিঘা জমিটি নাকি এখন সম্পূর্ণভাবে ভুমিমাফিয়াদের দখলে! প্রধান শিক্ষকের হাতে দান করা জমির আসল রেজিস্ট্রি দলিল থাকা সত্ত্বেও কেন উদ্ধার করা হচ্ছে না সেই জমি? স্থানীয়দের গুরুতর অভিযোগ শিক্ষা দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সব জেনেও অজ্ঞাত কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। জমি মাফিয়াদের সঙ্গে কোনো অশুভ আঁতাত রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন গ্রামবাসীরা।

সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে ‘গুণোৎসব’ করছে, বড় বড় বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, কিন্তু আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ একটা ভাঙা ক্লাবের ঘরে আটকে রয়েছে। সরকারি জমি দখল হয়ে যাচ্ছে আর প্রশাসন ঘুমিয়ে! ক্ষোভের সাথে বললেন স্থানীয় এক অভিভাবক। মারখুলিনের সচেতন নাগরিদের স্পষ্ট দাবি, অবিলম্বে জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা দপ্তরকে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।

জবরদখল হয়ে থাকা তিন বিঘা জমি অবিলম্বে উদ্ধার করে ভূমিলোভীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি উদ্যোগে অতি দ্রুত উক্ত জমিতে একটি আধুনিক, সুসজ্জিত ও স্থায়ী বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করে শিশুদের পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে হবে। অবিলম্বে সরকার যদি এই জরাজীর্ণ অবস্থা থেকে বিদ্যালয়টিকে মুক্ত না করে, তবে আগামী দিনে বৃহত্তর আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মারখুলিনের বাসিন্দারা।

Related Posts

প্রাচীন পুঁথি সংরক্ষণে গুরুত্ব মুখ্যমন্ত্রীর, শিবসাগরে বন্যার সমীক্ষা ৮৫ শতাংশ সম্পন্ন, ক্ষতিগ্রস্ত ৪২,৫০০টি বাড়ি চিহ্নিত

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৭ আগষ্টঃ জুলাইর ভয়াবহ বন্যার পর শিবসাগর জেলায় শুরু হওয়া দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন সমীক্ষার প্রায় ৮৫ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চলা এই সমীক্ষায়…

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও উজান অসমের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে শ্রীভূমি জেলা কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে সিপিআই(এম)-এর তীব্র বিক্ষোভ

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৭ আগষ্টঃ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, খাদ্যদ্রব্যের সীমাহীন মূল্যবৃদ্ধি রোধ এবং উজান আসামের সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, রেশনে বিনামূল্যে ছয় মাস খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ, এনরেগায় দুইশো…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *