প্রতি বছর একই চিত্র, তবুও নেই কার্যকর উদ্যোগ, প্রশ্নের মুখে জনপ্রতিনিধিরা
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২০ মেঃ আকাশে কালো মেঘ জমলেই এখন আতঙ্ক গ্রাস করে শিলচরবাসীকে। বজ্রপাতের শব্দ নয়, মানুষের বুক কাঁপে বৃষ্টির আশঙ্কায়। কারণ শহরবাসী জানেন একবার বৃষ্টি নামলেই শুরু হবে দুর্ভোগ, নোংরা নর্দমার জল ঢুকে পড়বে ঘরে, ব্যবসা বন্ধ হবে, রাস্তাঘাট ডুবে যাবে হাঁটু কিংবা কোমর জলে। বরাক উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র, শিক্ষা ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান শহর শিলচর আজ যেন পরিণত হয়েছে এক স্থায়ী জলাবদ্ধতার নগরীতে। আর এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য সরাসরি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন ক্ষুব্ধ নাগরিকরা।
শহরের সেন্ট্রাল রোড, রাধামাধব রোড, লিংক রোড, এন এস অ্যাভিনিউ, ন্যাশনাল হাইওয়ে পয়েন্ট, অম্বিকাপট্টি, মেহেরপুর, দাস কলোনি, শরৎপল্লী, নিউ মার্কেট ও ফাটক বাজার, বিবেকানন্দ রোড প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বর্ষা এলেই ডুবে যায়। সামান্য এক পশলা বৃষ্টিতেই শহরের রাজপথ নদীতে পরিণত হয়। কোথাও হাঁটু জল, কোথাও কোমর জল। বহু জায়গায় নর্দমার পচা, দুর্গন্ধযুক্ত কালো জল উপচে ঢুকে পড়ছে মানুষের শোওয়ার ঘরে, রান্নাঘরে, দোকানপাটে। রাতভর খাটের ওপর বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন বহু পরিবার। শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষদের জীবন কার্যত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ উঠছে পৌর প্রশাসন ও শাসক দলের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে। শহরবাসীর প্রশ্ন—প্রতিবার নির্বাচনের আগে কোটি কোটি টাকার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেই টাকা কোথায় গেল? কেন আজও একটি বিজ্ঞানসম্মত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে উঠল না? কেন বর্ষা এলেই শিলচরকে ডুবতে হয়? নাগরিকদের অভিযোগ, শাসক দলের নেতা, মন্ত্রী ও বিধায়করা শুধুমাত্র উদ্বোধন, ব্যানার, পোস্টার আর প্রচারে ব্যস্ত। বাস্তবে শহরের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে তাদের কোনো আন্তরিকতা নেই।
বরং বছরের পর বছর ধরে অপরিকল্পিত নির্মাণ, অবৈধ দখল, নিম্নমানের রাস্তার কাজ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকল্পের মাধ্যমে শহরটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এক প্রবীণ ব্যবসায়ী ব্যক্ত করে বলেন, নির্বাচনের সময় সবাই আসে। বড় বড় কথা বলে। কিন্তু বৃষ্টি নামলেই বোঝা যায় শহরের আসল চেহারা। দোকানে জল ঢুকে লক্ষ লক্ষ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। কেউ খোঁজ নিতে আসে না।

শুধু সাধারণ মানুষই নন, ক্ষোভ বাড়ছে ব্যবসায়ী মহলেও। জলমগ্ন রাস্তার কারণে বাজারে ক্রেতাদের আনাগোনা কমে যায়। বহু দোকানে জল ঢুকে নষ্ট হচ্ছে কাপড়, ওষুধ, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, খাদ্যপণ্য। দিনের পর দিন দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে আজ শিলচরের ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত বিপর্যস্ত। স্বাস্থ্য পরিস্থিতিও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। নর্দমার পচা জল জমে থাকায় ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, চর্মরোগসহ বিভিন্ন জলবাহিত রোগের আশঙ্কা বাড়ছে।
চিকিৎসকদের মতে, অপরিষ্কার পরিবেশ ও জলাবদ্ধতা দীর্ঘমেয়াদে ভয়ঙ্কর জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই দিকেও প্রশাসনের কোনো কার্যকর নজরদারি চোখে পড়ছে না। শহরের মানুষদের অভিযোগ, শিলচর পৌরনিগম বর্ষা এলেই শুধুমাত্র লোক দেখানো ড্রেন পরিষ্কারের নাটক করে। ক্যামেরা ডেকে দুদিন খাল পরিষ্কার করা হয়, তারপর আবার সব আগের মতো। প্লাস্টিক, পলিথিন ও আবর্জনায় ড্রেন মুখ বন্ধ হয়ে থাকলেও বছরের অধিকাংশ সময় প্রশাসনের কোনো তৎপরতা দেখা যায় না।
বিশেষ করে লিংক রোড, দাস কলোনি ও শরৎপল্লী এলাকার পরিস্থিতি এখন সবচেয়ে ভয়াবহ। রঙ্গিরখালের নাব্যতা কমে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই খাল উপচে রাস্তা ও বাড়িঘর প্লাবিত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের মদতে বছরের পর বছর খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয় দখল করে বহুতল নির্মাণ হয়েছে। অথচ প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। হাইলাকান্দি রোডের মেহেরপুর অঞ্চলের মানুষ আরও ক্ষুব্ধ জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্প নিয়ে।

অভিযোগ উঠেছে, এনএইচআই নির্মাণের সময় এলাকার প্রকৃত ড্রেনেজ ব্যবস্থা বিবেচনা করা হয়নি। মূল রাস্তার উচ্চতা বাড়িয়ে দেওয়া হলেও ভেতরের ড্রেন ও আউটলেটগুলো নিচু অবস্থায় রয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির জল বের হওয়ার কোনো পথ থাকছে না। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকার প্রকল্প হলেও কাজ হয়েছে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে।
বৃহত্তর তারাপুর এলাকার মানিলিবিল ও দুর্গানগর, রামনগর, চিরুকান্দি অঞ্চলের অবস্থাও শোচনীয়। বরাক নদীর জলস্তর বাড়লে ঘাঘরা নদীর স্লুইস গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, ফলে ভেতরের জমা জল বের হতে না পেরে গোটা এলাকা কৃত্রিম বন্যার কবলে পড়ে। বহু মানুষ অভিযোগ করছেন, বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যা চললেও স্থায়ী সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শহরের নাগরিক সমাজের একাংশের মতে, এই পরিস্থিতির জন্য শুধু প্রশাসন নয়, কিছু ক্ষেত্রে নাগরিক অসচেতনতাও দায়ী।
অনেকেই ড্রেনে প্লাস্টিক, বোতল, আবর্জনা ফেলে নিকাশি ব্যবস্থাকে আরও বিপর্যস্ত করছেন। কোথাও কোথাও বাড়ির সীমানা বাড়াতে গিয়ে ড্রেন ঢেকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আইন প্রয়োগ ও নজরদারির দায়িত্ব তাহলে কার? সমালোচকরা মন্তব্য করে বলেন, শাসক দলের জনপ্রতিনিধিরা উন্নয়নের নামে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রচার চালিয়েছেন, বাস্তব উন্নয়ন হয়নি। নগর উন্নয়নের তকমা পেলেও শিলচরের নাগরিক পরিষেবার অবস্থা আজ গ্রামের চেয়েও খারাপ বলে কটাক্ষ করছেন অনেকে। শহরে নেই আধুনিক ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নেই কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নেই সুসংহত ট্রাফিক পরিকল্পনা। উল্টে প্রতিদিন বাড়ছে যানজট, রাস্তার বেহাল দশা এবং জলাবদ্ধতা।
সচেতন মহলের স্পষ্ট বক্তব্য, আর জোড়াতালির কাজ করে শিলচরের ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বছরের পর বছর অস্থায়ী উদ্যোগ, লোকদেখানো ড্রেন পরিষ্কার এবং বর্ষা এলেই তড়িঘড়ি অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে কোনো স্থায়ী পরিবর্তন হয়নি। তাই এবার প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানসম্মত এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
নাগরিকদের দাবি, অবিলম্বে রঙ্গিরখাল, লংগাইখালসহ শহরের প্রধান নিকাশি খালগুলোর বৈজ্ঞানিক পুনর্খনন করতে হবে। খাল ও ড্রেনের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদে কঠোর অভিযান চালাতে হবে। একইসঙ্গে আধুনিক ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্পিং স্টেশন এবং সুপরিকল্পিত জল নিষ্কাশন পরিকাঠামো গড়ে তোলা ছাড়া শিলচরকে এই নিত্যদিনের জলযন্ত্রণা থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শহরবাসীর ক্ষোভ এখন চরমে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, আর কতদিন এই দুর্ভোগ সহ্য করতে হবে? প্রতি বর্ষায় কি এভাবেই জলবন্দি হয়ে পড়বে গোটা শহর? কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত হিসাব কোথায়? কেন আজও নাগরিকরা ন্যূনতম পরিষেবা থেকেও বঞ্চিত? বরাক উপত্যকার ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ এই শহর আজ যেন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে।
একদিকে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে ভাঙাচোরা রাস্তা, তীব্র যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সব মিলিয়ে শিলচরের নাগরিক জীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। ক্ষুব্ধ শহরবাসীর কণ্ঠে এখন একটাই দাবি, ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি এবার বাস্তব উন্নয়ন চাই। রাজনৈতিক প্রচার নয়, চাই কার্যকর কাজ। অবিলম্বে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিয়ে শিলচরকে এই জলযন্ত্রণা ও অব্যবস্থাপনার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা হোক। শিলচরকে বাঁচান এই আহ্বানই এখন শহরের প্রতিটি মানুষের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।





