১ সেপ্টেম্বর ফের ১০০০ কোটির ঋণ নিচ্ছেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, প্রতিটি অসমবাসীর মাথায় প্রায় ৬৪ হাজার টাকার ঋণ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩১ আগষ্টঃ উন্নয়নের চটকদার বিজ্ঞাপন, রাজকীয় উৎসব আর মেগা প্রকল্প ঘোষণার আড়ালে তলে তলে দেউলিয়া হওয়ার পথে হাঁটছে অসমের অর্থনীতি। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন সরকার দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর যখন নিজেদের ১০০ দিনের সাফল্য উদ্যাপনে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সামনে এলো রাজ্য অর্থনীতির এক কঙ্কালসার ও ভয়ঙ্কর রূপ। বিগত ১০০ দিনে রাজ্য সরকার এক প্রকার রেকর্ডের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছে রাজকোষকে তবে তা কোনো ইতিবাচক রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে নয়, বরং বেপরোয়া ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে।
গত একশো দিনে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সরকার মোট সাতবার ঋণের পাত্র হাতে বাজারে নেমেছে এবং তুলেছে ৬,৭৫০ কোটি টাকা। আগামী ১ সেপ্টেম্বর ফের ১,০০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, শপথ গ্রহণের দিন থেকে হিসাব করলে মাত্র পৌনে চার মাসের মধ্যেই শর্মা সরকার অসমবাসীর কাঁধে মোট ৭৭৫০ কোটি টাকার এক পর্বতপ্রমাণ ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিল।
রাজ্য সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা কীভাবে পুরোপুরি ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে, তার প্রমাণ মেলে গত চার মাসের ঋণ নেওয়ার পরিসংখ্যানে। গড়ে প্রতি দুই সপ্তাহে একবার করে খোলা বাজার থেকে হাজার কোটি টাকা করে তোলা হয়েছে। ১২ মে শপথের রেশ কাটতে না কাটতেই তোলা হয় ১,০০০ কোটি টাকা। ১২ মে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে শপথ গ্রহণের পর থেকেই ঋণ নেওয়ার ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে।
হিসাব বলছে, ২৬ মে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে আরও ৭৫০ কোটি টাকা। ১৬ জুন জুনের মাঝামাঝি সময়ে নেওয়া হয় ১,০০০ কোটি টাকা। ৩০ জুন মাস শেষের আগেই ফের ১,০০০ কোটি টাকার ঋণ। ২১ জুলাই জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে আবারও ১,০০০ কোটি টাকা। ৪ আগস্ট আগস্টের শুরুতেই রাজকোষে ঢোকে ১,০০০ কোটি টাকা। ১৮ আগস্ট স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবের আমেজ কাটার আগেই ১,০০০ কোটি টাকা। ১ সেপ্টেম্বর (প্রস্তাবিত) ফের ১,০০০ কোটি টাকার নতুন ঋণের তোড়জোড়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সমস্ত ঋণ তোলা হচ্ছে খোলা বাজার থেকে, যার সুদের হার গড়ে ৭.৫৬% থেকে ৭.৬২%। চড়া সুদের এই সুনির্দিষ্ট শর্তে ঋণ পরিশোধের যে দীর্ঘমেয়াদি দায় তৈরি হচ্ছে, তার খেসারত দিতে হবে রাজ্যের আগামী প্রজন্মকে। রাজ্যের সার্বিক ঋণের পরিসংখ্যান চোখ কপালে তোলার মতো। সম্প্রতি রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় সরকার যে তথ্য পেশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত অসমের মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,১৬,৬০৮ কোটি টাকা (দুই লক্ষ ষোল হাজার ছ’শত আট কোটি টাকা)।
অথচ বিধানসভায় পেশ করা তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত রাজ্যের সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ১.৭২ লক্ষ কোটি টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ বিগত কয়েক বছরে এই ঋণের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। এর একটি বড় অংশ প্রায় ১.৩০ লক্ষ কোটি টাকা—তোলা হয়েছে চড়া সুদের মুক্ত বাজার থেকে। এর ওপর নতুন করে চার মাসে ৭৭৫০ কোটি টাকা যোগ হওয়া রাজ্যের ভঙ্গুর আর্থিক ভিত্তিকেই স্পষ্ট করে দেয়।
রাজ্য সরকার যখন ঋণের টাকায় নিজেদের ‘সাফল্য’ বিজ্ঞাপন আকারে প্রচার করছে, ঠিক তখনই প্রকৃতির তাণ্ডব ও কেন্দ্রের বঞ্চনায় পিষ্ট হচ্ছে অসমের সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি প্রলয়ঙ্করি বন্যায় ঊর্ধ্ব বা আপার অসমের বিশাল এলাকা তলিয়ে গেছে। ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, পরিকাঠামো ছারখার হয়ে গেছে। হাজার হাজার পরিবার আজ ত্রাণশিবিরে দিন কাটাচ্ছে।
কিন্তু এই জাতীয় সংকটের মুহূর্তে তথাকথিত ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের ওপরের ইঞ্জিনটি সম্পূর্ণ নীরব। রাজ্য দুর্যোগ প্রশমন তহবিল (এসডিআরএফ) খাতে অসমের জন্য বরাদ্দ নির্ধারিত ৮৪৩ কোটি টাকার মধ্যে কেন্দ্র মাত্র ৩৭৯.৩৫ কোটি টাকা পাঠিয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন তহবিল (এনডিআরএফ) থেকে কেন্দ্র আজ পর্যন্ত অসমকে একটি ফুটো পয়সাও বরাদ্দ করেনি। একদিকে কেন্দ্রের আর্থিক হাতগুটানো, আর অন্যদিকে রাজ্য সরকারের নিজেদের সংস্থান বাড়াতে ব্যর্থ হওয়া দুইয়ের মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ করদাতা।
সরকারের এই বেলাগাম ঋণ গ্রহণ নীতি নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা সাংসদ গৌরব গগৈ। এক কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকারের দ্বিতীয় কার্যকালের ১০০ দিন সম্পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এই ১০০ দিন সাধারণ মানুষের জন্য কোনো স্বস্তি আনেনি, এনেছে শুধুমাত্র ঋণের বোঝায় জর্জরিত হওয়ার নজির। মাত্র চার মাসে ৭৭৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া মানে রাজ্যে যেন ঋণের গঙ্গা বইছে। ১ সেপ্টেম্বর যে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, তার ৭.৫৬% সুদের হার অসমের মানুষের পকেট থেকেই আদায় করা হবে।
সরকার ক্রমাগত ঋণ নিয়ে অসমবাসীর মাথায় মাথাপিছু ঋণের চাপ বাড়ানো ছাড়া আর কী কাজ করেছে? বর্তমানে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, রাজ্যের প্রতিটি নাগরিকের এমনকি সদ্যোজাত শিশুরও মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬৩,৬ ৩৬ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এটিই কি ডাবল ইঞ্জিন সরকারের উন্নয়নের নমুনা? ‘এ ফর আসাম’ যে বিজ্ঞাপন ও প্রচার চালানো হচ্ছে, এটিই কি তার পেছনের নির্দয় আর্থিক সত্য?
অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বা মূলধনী সম্পদ তৈরির জন্য ঋণ নেওয়া কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু যখন দেখা যায় দৈনন্দিন প্রশাসনিক খরচ মেটাতে বা অনুদানমূলক চটকদার প্রকল্প বজায় রাখতে চড়া সুদে মুক্ত বাজার থেকে বারবার ঋণ নিতে হচ্ছে, তখন বুঝতে হবে রাজ্যের নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের উৎস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
যে রাজ্য বন্যা আর নদীভাঙনে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে, সেই রাজ্য যদি চার মাসে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তবে তার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গভীর চিন্তার বিষয়। ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের এই ঋণের রথ ১ সেপ্টেম্বরের পর থামবে, নাকি অদূর ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা আরও নতুন উচ্চতা ছুঁয়ে সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করবে, এখন সেটাই অসমের কোটি কোটি জনগণের বড় প্রশ্ন।





