ছাত্র আন্দোলনের ইস্যুতে সরকারকে কোণঠাসা করতে মরিয়া বিরোধীরা
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১আগষ্ট, ২০২৬: দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্র-যুব আন্দোলন ঘিরে পুলিশের ভূমিকা এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন নতুন করে রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বৃহস্পতিবার লোকসভা ও রাজ্যসভা উভয় কক্ষেই বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র প্রধান নিশানায় ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বিরোধীদের অভিযোগ, এত বড় জাতীয় বিতর্কের পরও তিনি সংসদে উপস্থিত হয়ে কোনও ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না, যা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির পরিপন্থী।
দিনের শুরুতেই কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, অমিত শাহ সংসদে আসছেন না কেন? ছাত্র-যুবদের ওপর বর্বর হামলার জবাব তিনি দিচ্ছেন না কেন? তাঁর এই নীরবতায় অপরাধবোধেরই গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। রাহুলের এই মন্তব্য ঘিরেই রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সংসদের ভিতরেও একই সুরে সরব হন বিরোধী নেতারা।
প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ সংক্রান্ত বিল নিয়ে আলোচনার সময় কংগ্রেস সভাপতি ও রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গে, তৃণমূল কংগ্রেসের সাগরিকা ঘোষ, সিপিএমের জন ব্রিটাস, শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী)র সঞ্জয় রাউত সহ একাধিক বিরোধী সাংসদ প্রশ্ন তোলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোথায়? সংসদ ভবনে থাকলেও তিনি সভায় উপস্থিত হচ্ছেন না কেন? দেশের মানুষ তাঁর জবাব জানতে চায়।
রাজ্যসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মল্লিকার্জুন খাড়্গে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দেন সরকারের উদ্দেশে। তিনি বলেন, ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, পেলেট গান ব্যবহার এবং বলপ্রয়োগের নির্দেশ কে দিয়েছে? দিল্লি পুলিশ কার নিয়ন্ত্রণে? সিআরপিএফ কার নির্দেশে কাজ করেছে?
এত বড় ঘটনার পরেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে এসে বক্তব্য রাখছেন না কেন? যদি উত্তর দিতে না পারেন, তাহলে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত। খাড়্গে আরও অভিযোগ করেন, সরকার প্রকৃত সমস্যার সমাধান করতে আগ্রহী নয়; বরং রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতেই বিভিন্ন বিল নিয়ে ব্যস্ত। তাঁর দাবি, ছাত্রদের ওপর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।
তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সাগরিকা ঘোষও সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সংসদে এসে ক্ষমা চাইতে হবে এবং সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। যদি তিনি তা করতে না পারেন, তাহলে তাঁর পদত্যাগই একমাত্র পথ। লোকসভাতেও পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী সাংসদরা সংসদ চত্বরে বিক্ষোভ দেখান। পরে কংগ্রেস, তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকে-সহ বিভিন্ন বিরোধী দলের সাংসদরা প্ল্যাকার্ড হাতে ওয়েলে নেমে স্লোগান দিতে থাকেন।
হইচই ও বিক্ষোভের জেরে একাধিকবার অধিবেশন মুলতুবি করতে হয়। এদিন রাষ্ট্রগীত বন্দেমাতরমকে অসম্মানের শাস্তি আরও কঠোর করার লক্ষ্যে দ্য প্রিভেনশন অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (সংশোধনী) বিল, ২০২৬ সংসদে পেশ ও পাশ করান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের প্রধান হিসেবে অমিত শাহের অনুপস্থিতি নিয়েও বিরোধীরা প্রশ্ন তোলে। তাদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের সময়ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতি সরকারের রাজনৈতিক অস্বস্তিকেই প্রকাশ করছে।
সংসদে প্রশ্নপত্র ফাঁস বিরোধী বিল পাস হলেও রাজনৈতিক মহলে এখন আলোচনার কেন্দ্রে অন্য প্রশ্ন, ছাত্র-যুব আন্দোলন কি বিরোধী রাজনীতিকে নতুন করে এক মঞ্চে নিয়ে আসছে? বিশেষ করে ডিএমকে-র কড়া অবস্থান রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে নরম সম্পর্কের ইঙ্গিত থাকলেও, এদিন সরকারকে সরাসরি আক্রমণ করে ডিএমকে।
ফলে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, ইন্ডিয়া জোট কি আবার নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে? বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, তরুণ ভোটব্যাঙ্ককে সামনে রেখে বর্তমানে কোনও বিরোধী দলই সরকারের ঘনিষ্ঠতার বার্তা দিতে চাইছে না। ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে তৈরি হওয়া জনমত আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ভূমিকা নিতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে,দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ‘অপারেশন লোটাস’কি আপাতত ব্যাকফুটে চলে গেল?
এই মুহূর্তে বিরোধীদের মূল কৌশল স্পষ্ট, আন্দোলন, সংসদ এবং জনমত তিন ক্ষেত্রেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সরাসরি জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো। অন্যদিকে সরকার এখনও পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া দেয়নি। ফলে বিরোধীদের অভিযোগ আরও জোরালো হচ্ছে। তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভিযোগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নও সমান জরুরি। ছাত্র আন্দোলনে পুলিশি ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য জবাব সরকারের পক্ষ থেকে আসা প্রয়োজন।
একইসঙ্গে বিরোধীদের অভিযোগগুলিও প্রমাণ ও তদন্তের ভিত্তিতে বিচার হওয়া উচিত। কারণ সংসদ শুধু রাজনৈতিক সংঘর্ষের মঞ্চ নয়, সরকারের জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। আগামী কয়েক দিনের সংসদীয় অধিবেশন তাই শুধু আইন প্রণয়নের জন্য নয়, বরং এই রাজনৈতিক সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয় এবং সরকার শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান গ্রহণ করে, সেদিকেই এখন গোটা দেশের নজর।





