বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ আগষ্টঃ দক্ষিণ কাছাড়ের হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী, চা-বাগান শ্রমিক পরিবারের সন্তান, সাধারণ নাগরিক এবং আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় (শিলচর) এর সম্ভাব্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়েছে বরাক উপত্যকাজুড়ে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে এবার সরাসরি হস্তক্ষেপ করলেন শিলচর লোকসভা সমষ্টির সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য। দিল্লিতে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশীর সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন তিনি।
সাংসদ শুক্লবৈদ্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের এই ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইই নয়, বরং সমগ্র বরাক উপত্যকার সামগ্রিক শিক্ষা পরিকাঠামো, উচ্চশিক্ষা এবং বিভিন্ন কেন্দ্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আধুনিকীকরণ নিয়েও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন। বর্তমানে ‘প্রজেক্ট মোড’-এ পরিচালিত এই বিদ্যালয়টি চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। শিক্ষামন্ত্রীকে দেওয়া আবেগঘন আবেদনপত্রে সাংসদ উল্লেখ করেন, বিদ্যালয়টি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বছরে প্রায় ৩ কোটি টাকা প্রয়োজন। কিন্তু আসাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষে বর্তমানে এই বিশাল অর্থ বহন করা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিমল শুক্লবৈদ্য জোর দিয়ে বলেন, শুধুমাত্র অর্থের অভাবে এমন একটি প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। এটি শত শত শিশুর ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল। এই বিদ্যালয়টি স্রেফ একটি কংক্রিটের ভবন নয়; এটি হাজারো পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক এবং প্রান্তিক মানুষের স্বপ্নপূরণের একমাত্র ভরসা।
বর্তমানে বালভাটিকা-৩ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৫০০ জন শিক্ষার্থী এখানে পাঠরত। তাঁদের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে নিয়োজিত আছেন ১৪ জন নিয়মিত এবং ৯ জন চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক। প্রতি বছর আসন সংখ্যার তুলনায় বহুগুণ বেশি—প্রায় ৯০০-রও বেশি শিক্ষার্থী এখানে ভর্তির আবেদন জানায়, যা প্রান্তিক অঞ্চলে এই স্কুলের বিশাল জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেয়।
সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন যে, এই বিদ্যালয়টি বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নদী ও পাহাড়ঘেরা অনগ্রসর চা-বাগান এলাকার বাসিন্দারা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের চা-বাগানগুলো, ওয়েস্ট জালিঙ্গা, রোজকান্দি, বরজালেঙ্গা, দার্বি, অ্যালেনপুর, শিলকুড়ি, বরাখাই, বিনোদনগর, কৈলাসপুর আইরিংমারা এই ১০টি বৃহৎ চা-বাগান এবং আশপাশের বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র চা-বাগানের হাজার হাজার শ্রমিকের সন্তানের কাছে মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষার একমাত্র ভরসাস্থল হলো এই বিদ্যালয়। চরম আর্থিক অনটনের মধ্যেও শ্রমজীবী মানুষেরা সন্তানদের মানুষ করার যে স্বপ্ন দেখছেন, স্কুল বন্ধ হলে সেই আশার আলো চিরতরে নিভে যাবে।
এর পাশাপাশি, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩৫০ জন নিয়মিত শিক্ষক এবং ৩০০ জন নিয়মিত অশিক্ষক কর্মচারীর সন্তানদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রধান আশ্রয় এই স্কুলটি। বিদ্যালয়টি বন্ধ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী পরিবারগুলো গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, যার নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশেও গিয়ে পড়বে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য শিক্ষামন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব দেন যে, বিদ্যালয়টির জন্য প্রয়োজনীয় নিজস্ব অবকাঠামো, শ্রেণিকক্ষ ও আনুষঙ্গিক সুবিধা ইতিমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। ফলে নতুন করে পরিকাঠামো গড়ার কোনো আর্থিক বোঝা তৈরি হবে না।
তাই বিলম্ব না করে ‘প্রজেক্ট মোড’ থেকে বের করে বিদ্যালয়টিকে ‘কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় সংগঠন’ এর অধীনে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানান তিনি। বৈঠক শেষে নতুন দিল্লির আসাম ভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য জানান, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশী পুরো বিষয়টি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং বিষয়টিকে সংবেদনশীল ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন।
শিক্ষামন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে, কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় সংগঠনের শীর্ষ আধিকারিক ও আসাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত একটি স্থায়ী সমাধানের পথ বের করা হবে। সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজির দূরদর্শী নেতৃত্বে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর আন্তরিক পদক্ষেপে কোনো শিশুর শিক্ষার অধিকার অর্থের অভাবে কেড়ে নেওয়া হতে পারে না।
আমি বিশ্বাস করি, দ্রুতই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে এবং আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে। সীমান্তবর্তী বরাক উপত্যকায় শিক্ষার আলো ধরে রাখতে দিল্লির দরবারে সাংসদের এই জোরালো পদক্ষেপ এখন গোটা দক্ষিণ কাছাড়জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।






