হাইলাকান্দির ঐতিহ্যবাহী এস কে কলেজে শৃঙ্খলার নামে ‘হিটলারি শাসন’?

অভিযোগের তির সরাসরি কলেজের বিতর্কিত অধ্যক্ষ রতন কুমারের দিকে। নিগ্রহের শিকার বাণিজ্য বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র সিদ্ধার্থ দাস। যদিও এই শারীরিক হেনস্থার অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ সূত্রে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে ঘটনার পর থেকেই গোটা কলেজ চত্বরে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা। ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, মঙ্গলবার কলেজ প্রাঙ্গণে অবস্থিত একটি ফুলবাগানের সৌন্দর্যবর্ধক দেওয়ালে অসাবধানতাবশত বসেছিলেন প্রথম বর্ষের ছাত্র সিদ্ধার্থ দাস। কাকতালীয়ভাবে সেই দেওয়ালটি ভারতের জাতীয় পতাকার তিন রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রঙ করা হয়েছিল।

অভিযোগ, এটি দেখামাত্রই মেজাজ হারান অধ্যক্ষ রতন কুমার। দেশের জাতীয় পতাকার অবমাননা হয়েছে, এই অজুহাত তুলে তিনি উক্ত ছাত্রের ওপর চড়াও হন এবং প্রকাশ্যে তাঁকে চড়-থাপ্পড় মারেন বলে দাবি করা হয়েছে। একজন শিক্ষকের, বিশেষ করে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে থাকা একজন অধ্যক্ষের এমন লাগামহীন ও আক্রমণাত্মক আচরণে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন উপস্থিত সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মুহূর্তের মধ্যে এই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে কলেজের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘটে বসে পড়েন।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের তোলা প্রশ্নগুলো আজ প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখের ওপর এক বিরাট বড় আয়না তুলে ধরেছে, দেওয়াল যদি জাতীয় পতাকার রঙে আঁকা হয়েই থাকে, তবে সেখানে বসার মতো একটি সামান্য ভুলের জন্য শারীরিক হেনস্থা ও মারধর কতটা যুক্তিযুক্ত? ভুল শুধরে দেওয়ার জন্য কি শিক্ষাসুলভ সংবেদনশীলতা যথেষ্ট ছিল না?

আইনের শাসন ও প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে স্বয়ং অধ্যক্ষ কীভাবে নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারেন? বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সাফ জানিয়ে দেন, নিছক ভুল আর অপরাধের মধ্যে ফারাক বোঝার মতো ন্যূনতম প্রশাসনিক দক্ষতা কি অধ্যক্ষের নেই? ঘটনার সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষ প্রমাণ হলে উপযুক্ত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন আন্দোলনকারীরা।

ঘটনার খবর পেয়ে মাঠে নামে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)। ঐতিহ্যবাহী এই কলেজে অধ্যক্ষ রতন কুমারের বিরুদ্ধে এমন অসংবেদনশীল ও তুঘলকি আচরণের অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। এবিভিপি-র পদাধিকারীরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ তোলেন, পূর্বেও এই কলেজে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে বারবার চরম দুর্ব্যবহার করেছেন অধ্যক্ষ।

শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে তাঁদের পার্ক করে রাখা মোটরসাইকেলে সশব্দে লাথি মেরে ফেলে দেওয়ার মতো চরম অপেশাদার আচরণ করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিভিন্ন ছুতোনাতায় শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিকভাবে হয়রানি করা যেন নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এবিভিপি-র নেতৃত্ব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়, কলেজে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই কোনো শিক্ষার প্রাঙ্গণে ‘হিটলারি শাসন’ চলতে দেওয়া হবে না।

সকাল থেকে শুরু হওয়া এই ছাত্র আন্দোলন বিকেল প্রায় ৫টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে। কলেজের পঠনপাঠন ও প্রশাসনিক কাজকর্ম একপ্রকার স্তব্ধ হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি ক্রমাগত জটিল হতে দেখে শেষমেশ সুর নরম করতে বাধ্য হন কলেজ কর্তৃপক্ষ। বিকেলে আন্দোলনরত এবিভিপি-র শীর্ষ পদাধিকারীদের নিজের কক্ষে ডেকে এনে এক রুদ্ধদ্বার আলোচনায় বসেন অধ্যক্ষ রতন কুমার। দীর্ঘ আলোচনার পর অধ্যক্ষ সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, আলোচনার মাধ্যমে এদিনের উদ্ভূত পরিস্থিতির ‘নিষ্পত্তি’ করা হয়েছে।

অধ্যক্ষ মহাশয় ‘নিষ্পত্তি’র কথা বললেও সচেতন মহল ও অভিভাবক সমাজ কিন্তু মোটেও শান্ত হতে পারছেন না। একটি ঐতিহ্যবাহী কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা শারীরিক নিগ্রহের মতো গুরুতর অভিযোগ কি স্রেফ টেবিল-আলোচনার আড়ালে চাপা পড়ে যাবে? শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা করা আর ক্ষমতার অপব্যবহার করা, এই দুয়ের সূক্ষ্ম রেখাটি যিনি অনুধাবন করতে পারেন না, তিনি কতটা যোগ্যতার সাথে অভিভাবকের আসন সামলাচ্ছেন, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। হাইলাকান্দির সুশীল সমাজ এখন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে এই ঘটনার আদৌ কোনো উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, নাকি ছাত্র নিগ্রহের মতো ঘটনা ‘মিটমাট’ এর আড়ালে চিরতরে ধামাচাপা পড়ে থাকবে?

Related Posts

ছত্তিশগড়ের রাজ্যপাল রমেন ডেকাকে নিয়ে আপত্তিকর কার্টুন ও পোস্ট শেয়ার করার ঘটনায় হাই কোর্টের বিশেষ রায়

সাংবিধানিক পদের অবমাননা মামলা: নিঃশর্ত ক্ষমা ও কড়া শর্তে স্বস্তি পেলেন দুই যুবক বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ আগষ্টঃ ছত্তিশগড়ের রাজ্যপাল রমেন ডেকাকে নিয়ে আপত্তিকর কার্টুন ও মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ…

সুপ্রিম কোর্টে স্বস্তি কংগ্রেসের, গৌহাটি হাইকোর্টে ফিরল মামলা, আইনি সুতোয় ঝুলছে বিজেপি সাংসদ কৃপানাথ মাল্লার ভাগ্য!

১৮ হাজার ভোটের জয় নিয়ে এবার আইনি আতশিকাঁচের নিচে বিজেপি সাংসদ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ আগষ্টঃ করিমগঞ্জ (বর্তমান শ্রীভূমি) লোকসভা কেন্দ্রের ২০২৪ সালের নির্বাচনী লড়াই কি তবে শেষ হয়েও শেষ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *