রাজনীতির কাঠগড়ায় জনপ্রতিনিধি, দেশের ৪ হাজারের বেশি ফৌজদারি মামলায় আটকে দেশের আইনপ্রণেতারা

আইন যেখানে সবার জন্য সমান হওয়ার কথা, সেখানে ক্ষমতার অলিন্দে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চলা মামলাগুলি বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা এক নির্মম বাস্তবায়ন। প্রবীণ আইনজীবী তথা অ্যামিকাস কিউরি বিজয় হংসারিয়ার সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা ২২তম প্রতিবেদন অনুসারে, বিচারাধীন ৪,১৯২টি মামলার মধ্যে ৫১৯টি মামলা ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, শুধু বিচারপর্বই নয়, প্রায় ৭০০টি মামলা তদন্তের পর্যায়েই আটকে রয়েছে। এর মধ্যে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ৩৬০টি মামলায় তিন বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত কোনো চার্জশিট দাখিল করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থাগুলি।

মোট মামলার পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ৭৫৪টি মামলা ৫ থেকে ১০ বছর ধরে বিচারাধীন। ৫৬২টি মামলা ৩ থেকে ৫ বছর ধরে ঝুলে আছে। ১,০৯৫টি মামলা ৩ বছরেরও কম সময় ধরে বিচারাধীন রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন হাইকোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই ভয়াবহ চিত্রটি উঠে এসেছে। যে সমস্ত রাজ্য বা হাইকোর্টগুলিতে আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে,

তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ (১,১৭১টি)। এর পরেই রয়েছে কেরালা (৫৪৩টি), বিহার (৩৭৩টি), মহারাষ্ট্র (৩৬৪টি) এবং ওড়িশা (৩৩০টি)। এলাহাবাদ হাইকোর্ট সরাসরি তাদের নিজস্ব রিপোর্ট জমা না দেওয়ায়, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের ওয়েবসাইটে উপলব্ধ তথ্যকে ভিত্তি করেই এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।

আইনপ্রণেতাদের পাশাপাশি দেশের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ১৪টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বর্তমানে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এ. রেভন্ত রেড্ডি, যাঁর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৮৯টি মামলা বিচারাধীন।

এর পরেই রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সুবেন্দু অধিকারী (প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যানুযায়ী ২৯টি মামলা বিচারাধীন)। কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি. কে. শিবকুমার এবং অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন. চন্দ্রবাবু নাইডু উভয়ের বিরুদ্ধেই ১৯টি করে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কেরলের মুখ্যমন্ত্রী ভি. ডি. সতীশন-এর বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ১৮টি।

জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে চলা এই সমস্ত ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করার উদ্দেশ্যে অ্যামিকাস কিউরি বিজয় হংসারিয়া সুপ্রিম কোর্টের কাছে বেশ কিছু কঠোর ও যুগান্তকারী সুপারিশ পেশ করেছেন, যতক্ষণ না আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন সমস্ত মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে, ততক্ষণ নির্দিষ্ট আদালতগুলিকে একপেশেভাবে বা বিশেষভাবে কেবল এই মামলাগুলির শুনানি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হোক।

যে সমস্ত মামলা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে রয়েছে, সেগুলির ক্ষেত্রে কোনো বিরতি না রেখে প্রতিদিন শুনানি করা বাধ্যতামূলক করা হোক। কঠোর পদক্ষেপ, কোনো অভিযুক্ত আইনপ্রণেতা যদি পরপর দু’টি শুনানিতে আদালতে হাজির হতে ব্যর্থ হন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে অ-জামিনযোগ্য পরোয়ানা জারি করা উচিত।

সাক্ষীদের সশরীরে আদালতে হাজির করানোর সুবিধার্থে একজন করে ‘নোডাল প্রসিকিউশন অফিসার’ নিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি, মামলার রিয়েল-টাইম আপডেট এবং অর্ডার শিট বা আদালতের নির্দেশিকা সংক্রান্ত নথিগুলি সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের ওয়েবসাইটে নিয়মিত আপলোড করার সুপারিশ করা হয়েছে।

জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে যদি এহেন গুরুতর ফৌজদারি মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তবে তা সাধারণ মানুষের মনে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। অপরাধ ও রাজনীতির এই অনভিপ্রেত আঁতাত ভাঙতে সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া পদক্ষেপ এবং বিচার প্রক্রিয়ার দ্রুত রূপায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এই দীর্ঘমেয়াদী বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাজনীতিতে অপরাধের প্রভাব রোধে সাধারণ নাগরিক হিসেবে আপনার মতামত কী?

Related Posts

শ্রীভূমিতে ৩৭ নম্বর জাতীয় সড়কের এককালীন উন্নয়ন প্রকল্পের ভূমিপূজন, দুর্গাপূজার পরই শুরু হচ্ছে সড়ক নির্মাণকাজ

অনুষ্ঠানে সীমান্ত বাণিজ্য ও আন্তঃরাজ্য যোগাযোগব্যবস্থা সুদৃঢ় করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শ্রীভুমি ২২ আগষ্টঃ ব্রডগেজ বাস্তবায়নের মাধ‍্যমে রেলপথে দেশের অন‍্যান‍্য প্রান্তের সঙ্গে যেমন বরাক…

সিএএ প্রক্রিয়ায় গতি আনতে কেন্দ্রের ঐতিহাসিক সিটিজেনশিপ থার্ড অ্যামেন্ডমেন্ট রুলস, ২০২৬ কার্যকর

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২২ আগষ্টঃ প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া অমুসলিম সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়ায় এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *