অবৈধ অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত জনগণনা বন্ধের দাবি, ১৯৫১-কে ভিত্তিবর্ষ করার প্রস্তাব, বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে হিংসা ও অস্থিরতার মধ্যে থাকা মণিপুরে এবার জনগণনাকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ২০২৭ সালের জনগণনা শুরুর আগে এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস) কার্যকর এবং কথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের’শনাক্ত করার দাবিতে পথে নেমেছে ছাত্র ও নাগরিক সমাজের একাধিক সংগঠন। এরই মধ্যে দ্য জাস্ট অ্যান্ড ফেয়ার ডিলিমিটেশন (জেএফডি) দু’দিনের সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
সোমবার, ১৭ আগস্ট মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছে ধর্মঘট। আন্দোলনকারীদের দাবি, কথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের পরিচয় নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত জনগণনা সংক্রান্ত সমস্ত কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হবে। একই সঙ্গে এনআরসি-র ক্ষেত্রে ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ হিসেবে গ্রহণ করার দাবি জানিয়েছে জেএফডি। ২০২৭ সালের জনগণনার প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
১৭ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে ‘সেল্ফ-এনিউমারেশন’বা নিজেদের তথ্য নিজেরাই নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া। এরপর ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে মূল বাড়ির তালিকা তৈরির কাজ। এই সময়েই জেএফডি-র ধর্মঘটের ডাক ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁদের দাবি পূরণ না হলে জনগণনা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বয়কট করা হবে।
ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে ইম্ফল উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায়। আন্দোলনের সমর্থনে বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র খোয়াইরামবন্দ কেইথেল বন্ধ ছিল। বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলি বিক্ষোভ দেখায়। এদিকে ধনমঞ্জুরি বিশ্ববিদ্যালয়ে জনগণনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ বন্ধ করার চেষ্টা করেন একদল ছাত্র। সেই সময় ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের কথিত লাঠিচার্জে অন্তত দুই জন বিক্ষোভকারী আহত হন। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ছাত্ররা কেইথেল থেকে কেইসমপাট পর্যন্ত মিছিল বের করেন। মিছিল থেকে জনগণনার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে জনগণনা বয়কট করার আহ্বান জানানো হয়। এই বিক্ষোভে সিসি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের ছাত্ররাও অংশ নেয় বলে প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে। ফলে জনগণনাকে ঘিরে আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেএফডি-র ডাকা ধর্মঘটকে সমর্থন জানিয়েছে একাধিক নাগরিক সমাজের সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড মেইতেই নাগা কমিটি মণিপুর, ফেডারেশন অব নাগা সিভিল সোসাইটি, চাঁদেল নাগা পিপলস অর্গানাইজেশন, ইউনাইটেড মেইতেই পাঙ্গাল কমিটি এবং নেটিভ পিপলস কমিটি মণিপুর। ফলে এনআরসি ও জনগণনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া আন্দোলন কেবল একটি ছাত্র সংগঠনের কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, নাগরিক সমাজের একাংশও এতে যুক্ত হচ্ছে।
এর পাশাপাশি ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্ভাব্য ‘ভূমি বিনিময়’নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অল মণিপুর স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। সংগঠনটির আশঙ্কা, এমন কোনও পদক্ষেপ মণিপুরের আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
মণিপুরে দীর্ঘদিনের হিংসা ও অস্থিরতার আবহে জনগণনার প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকারি স্তরে ২০২৭ সালের জনগণনার প্রস্তুতি এগোচ্ছে, অন্যদিকে কথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্তকরণ এবং এনআরসি কার্যকর করার দাবিতে পথে নেমেছে ছাত্র ও নাগরিক সমাজের একাংশ।
জনগণনা শুরুর আগেই এনআরসি কার্যকর হবে কি না, ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ করা হবে কি না এবং আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে জনগণনা প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হবে কি না, এই তিন প্রশ্নেই এখন নজর মণিপুরের দিকে। ধর্মঘট ও বিক্ষোভের পরবর্তী কর্মসূচি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে কি না, সেটিই এখন দেখার।





