কালাইনের বাবুর বাজারে বেপরোয়া মাটি মাফিয়ারা, জেসিবি চালিয়ে পাহাড় কেটে লাল মাটি পাচারের নিত্য খেলা!

স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, দিনের আলো থাকা পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও সন্ধ্যা নামার পরপরই রূপ বদলাতে শুরু করে বাবুর বাজার এলাকা। জনবসতি ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় নামানো হয় বিশাল বিশাল জেসিবি । গভীর রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে পাহাড় কেটে মাটি তোলার প্রক্রিয়া।

এরপর শত শত ঢালু ট্রাক ও ডাম্পারে সেই লাল মাটি বোঝাই করে পাচার করা হয় বিভিন্ন নির্মাণাধীন এলাকা ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে। সূর্য ওঠার আগেই মাটি মাফিয়ারা সমস্ত ভারী যন্ত্রপাতি ও যানবাহন সরিয়ে ফেলে এলাকা পুরোপুরি ফাঁকা করে দেয়। পুরো কর্মকাণ্ডটি এত সুপরিকল্পিত এবং দ্রুততার সাথে ঘটানো হয় যাতে দিনের আলোয় কোনো প্রমাণ না থাকে।

কালাইন বন বিভাগের আওতাধীন বাবুর বাজার এলাকায় বেআইনিভাবে পাহাড় কেটে লাল মাটি পাচারের ঘটনায় বিট অফিসার মিন্টু বড়ুয়ার ভূমিকা নিয়ে সচেতন নাগরিক সমাজে এখন তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। সাধারণ মানুষের মতে, এই সুসংগঠিত মাটি পাচার চক্রের পেছনে স্থানীয় বন প্রশাসনের শীর্ষস্তরের মৌন সম্মতি বা প্রত্যক্ষ আশ্রয় ছাড়া এত বড় কাণ্ড ঘটানো একেবারেই অসম্ভব।

যেখানে সংরক্ষিত বনাঞ্চল বা সরকারি এলাকায় সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে সামান্য গাছের একটা ডাল কাটলে কিংবা ছোটখাটো কোনো কাজ করতে গেলেই বন বিভাগের নজরদারি টিম মুহূর্তের মধ্যে হাজির হয়ে যায় এবং জরিমানা বা আইনি নোটিশ ধরায়।

সেখানে রাত নামলেই বিশালকার জেসিবি মেশিনের বিকট শব্দে পাহাড় গুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর একের পর এক শত শত ডাম্পার ও ভারী ট্রাকে মাটি বোঝাই করে পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রকাশ্যে অথচ সেই শব্দ নাকি বিট অফিসার কিংবা তাঁর অধীনস্থ কর্মীদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না! এই ধরনের যুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

রাতভর রাজপথ কাঁপিয়ে মাটি বোঝাই ট্রাক চলাচলের ঘটনা কোনো গোপন বা অলক্ষ্য বিষয় নয়। প্রতিদিনের এই বিশাল কর্মকাণ্ডের খবর কালাইন বন বিভাগের বিট অফিসার মিন্টু বড়ুয়ার জানা থাকবে না, এমন দাবি কেবল হাস্যকরই নয়, প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার মুখে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়।

স্থানীয় অভিজ্ঞ মহলের অভিযোগ, বিট অফিসারের নজরদারি ব্যবস্থার এই চরম ব্যর্থতা নিছক অসাবধানতা বা উদাসীনতা হতে পারে না। যদি সত্যিই তিনি এই বিশাল অপরাধ চক্রের বিষয়ে অনবগত থাকেন, তবে তা তাঁর পদের চরম অযোগ্যতা প্রমাণ করে। আর যদি তিনি জেনেও চোখ বন্ধ করে থাকেন, তবে নিশ্চিতভাবেই এর পেছনে মাটি মাফিয়াদের সাথে কোনো লাভজনক গোপন সমঝোতা বা আর্থিক যোগসাজশ রয়েছে।

বন বিভাগের মতো একটি সংবেদনশীল সরকারি দপ্তরের স্থানীয় প্রধান হিসেবে যেখানে বনাঞ্চল, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার মূল দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত, সেখানে তাঁর নাকের ডগায় রাতের আঁধারে প্রকৃতির এই হরিলুট প্রশাসনিক কাঠামোর কঙ্কালসার রূপকেই উন্মোচিত করছে।

অভিযোগ উঠেছে, বিট অফিসার মিন্টু বড়ুয়ার কথিত অনুকম্পা ও প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগ নিয়েই মাটি মাফিয়ারা এমন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বনাঞ্চল সুরক্ষা এবং পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের এই নীরবতা কার্যত অপরাধীদের সুরক্ষা দিচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন। তবে এই বিস্ফোরক অভিযোগের বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো সরকারি এবং সংশ্লিষ্ট বন আধিকারিক বা বিট অফিসার মিন্টু বড়ুয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঢাল কেটে অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাটি সরিয়ে নেওয়ার ফলে সমগ্র কালাইন অঞ্চলে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘনীভূত হচ্ছে, অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটার ফলে বর্ষার মৌসুমে মারাত্মক ভূমিক্ষয় ও পাহাড়ি ধস নামার চরম ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। পাহাড় ধসের কারণে আশপাশের গ্রামীণ সড়ক, কৃষি জমি এবং সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি যেকোনো সময় বিলীন হয়ে যেতে পারে। গভীর রাতে ভারী ট্রাক ও ডাম্পার চলাচলের দরুণ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙছে এলাকাবাসীর, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

এছাড়া অতিরিক্ত মাটি বোঝাই ট্রাক চলাচলের ফলে গ্রামের কাঁচা-পাকা রাস্তাঘাট ভেঙে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। বিট অফিসার মিন্টু বড়ুয়ার এমন রহস্যজনক ভূমিকা এবং কালাইন বন বিভাগের নির্লিপ্ততার বিরুদ্ধে এখন সোচ্চার সমগ্র সচেতন মহল।

তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, কেবল নিচের তলার কর্মচারীদের বলির পাঁঠা না বানিয়ে, এই বেআইনি মাটি পাচার চক্রে বিট অফিসার সহ জড়িত অন্যান্য আধিকারিকদের কলঙ্কিত ভূমিকা অবিলম্বে নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্তের আওতায় আনতে হবে। প্রশাসনিক গাফিলতি ও স্বজনপোষণের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে অবিলম্বে বরখাস্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ধারায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি উঠেছে।

বাবুর বাজার ও সংলগ্ন এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় অতি দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তাঁদের মূল দাবিগুলো হলো, অবিলম্বে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ দপ্তরের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত দল গঠন করে রাতভর অভিযান চালাতে হবে এবং বেআইনি মাটি কাটার স্থানগুলো চিহ্নিত করতে হবে।

মাটি কাটার কোনো বৈধ সরকারি অনুমতি পত্র আছে কি না এবং পরিবাহিত ট্রাকগুলোর চালান সঠিক কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। বিট অফিসার মিন্টু বড়ুয়া সহ জড়িত অন্যান্য বনকর্মীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখে অপরাধীদের সাথে কোনো আাতাত পাওয়া গেলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। বনাঞ্চল ও পাহাড় সুরক্ষায় বাবুর বাজার এলাকায় নিয়মিত পুলিশ ও বন বিভাগের যৌথ টহল চালু করতে হবে।

প্রাকৃতিক পাহাড় ও মাটির স্বকীয়তা রক্ষা করা কোনো একক ব্যক্তির দায়িত্ব নয়, এটি সার্বজনীন সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগ যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে আগামী দিনে অঞ্চলটি এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, অভিযোগের ভিত্তিতে কাছাড় জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের শীর্ষ আধিকারিকরা কী ভূমিকা গ্রহণ করেন।

Related Posts

দুই বছরের নীরবতার পর পিএম কেয়ার্সের হিসাব প্রকাশ, ৮,৪৫২ কোটি টাকা তহবিলে পড়ে রয়েছে

এক বছরে খরচ মাত্র ৮৭ লক্ষ, অনুদান ও সুদে আয় ১,২০০ কোটির বেশি, স্বচ্ছতা নিয়ে সোচ্চার বিরোধীরা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ দুই বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে পিএম কেয়ার্স…

জনগণনার আগেই এনআরসি-র দাবিতে উত্তাল মণিপুর, দু’দিনের ধর্মঘটে ছাত্র সংগঠন

অবৈধ অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত জনগণনা বন্ধের দাবি, ১৯৫১-কে ভিত্তিবর্ষ করার প্রস্তাব, বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে হিংসা ও অস্থিরতার…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *