ভারতের রেলস্টেশনে জলের নামে বিষ গিলছেন ট্রেনের যাত্রীরা! ওয়াটার কুলারে বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া ই-কোলাইয়ের থাবা

দূরপাল্লার ট্রেন বা প্ল্যাটফর্মে যাতায়াতের সময় ভরসা করে যে ওয়াটার কুলার বা প্ল্যাটফর্মের কল থেকে হাজার হাজার যাত্রী প্রতিদিন তৃষ্ণা নিবারণ করেন, সেই কলেই মিলল প্রাণঘাতী ‘ই-কোলাই’ সহ একাধিক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া। গত ১২ আগস্ট সংসদে পেশ করা এই অডিট রিপোর্টে দেশের শত শত রেলস্টেশনের জনস্বাস্থ্য ও ন্যূনতম পরিষেবা ব্যবস্থাপনার চরম কঙ্কালসার চেহারাটি অনাবৃত হয়ে পড়েছে।

ক্যাগ এর চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫১২টি অ-উপনগরীয় রেলস্টেশনে পুঙ্খানুপুঙ্খ অডিট চালিয়ে দেখা গেছে, দেশের প্রথম সারির ভিআইপি ও জংশন স্টেশনগুলোর পানীয় জল একেবারেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনের ওয়াটার কুলার ও কলের জলের নমুনায় মিলেছে বিপজ্জনক ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া, যা মানবদেহে প্রবেশ করলে মারাত্মক পেটের সংক্রমণ, কিডনির রোগ থেকে শুরু করে জীবন সংশয় পর্যন্ত ঘটাতে পারে।

ট্রেনের দীর্ঘ সফরের মাঝে প্ল্যাটফর্মের ওয়াটার কুলার বা পানের কল থেকে গ্লাস ভরে জল খাওয়ার অভ্যাসে এবার বড়সড় সতর্কবার্তা দিল কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (ক্যাগ) এর সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্ট। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ব্যস্ততম ও ঐতিহ্যবাহী রেলস্টেশনগুলির ওয়াটার কুলারের জলের নমুনায় ধরা পড়েছে মারাত্মক ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি। সাধারণ যাত্রীরা যে জল নির্দ্বিধায় পান করছেন, তা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ও জীবনঘাতী হতে পারে, রিপোর্টে অঞ্চলভিত্তিক সেই বিভীষিকাময় চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

সিএজি রিপোর্টে বিভিন্ন রেল জোনের বিষাক্ত বাস্তব চিত্র দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য ও ভ্রমণ কেন্দ্র কোয়েম্বাটোর জংশন এবং গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশন পালাক্কাডের ওয়াটার কুলার থেকে সংগৃহীত পানীয় জলের নমুনা পরীক্ষা করে ক্ষতিকর ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া পজেটিভ পাওয়া গেছে। ঐতিহ্যবাহী ও অত্যন্ত ব্যস্ত হায়দরাবাদ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ও ওয়াটার কুলারের জলও এই বিষাক্ত ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার ঝুঁকির আওতামুক্ত নয় বলে স্পষ্ট জানানো হয়েছে রিপোর্টে।

মধ্য ভারতের রেল জোনের অন্যতম বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বই ও তার সংলগ্ন অঞ্চলের ব্যস্ততম স্টেশন, ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাস ভিওয়ান্দি রোড, কল্যাণ এবং লোনাভালার মতো প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রী যাতায়াত করা স্টেশনগুলির ওয়াটার কুলারের জলে মিলেছে একই প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়া। পূর্ব ভারতের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল মধুপুর স্টেশনের পানীয় জলের নমুনা পরীক্ষা করেও মেলেনি স্বস্তির বার্তা, সেখানেও ই-কোলাই পজিটিভ ধরা পড়েছে।

যাত্রীদের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসুরক্ষা শিকেয় তুলে এভাবে ই-কোলাই যুক্ত জল পরিবেশন করায় রেলের নজরদারি প্রোটোকল ও ওয়াটার কুলার পরিচ্ছন্নতার মান নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সিএজি-র এই তথ্যের পর দেশের যাত্রীসাধারণের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যাত্রীদের স্বাস্থ্য নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষের এই চরম গাফিলতি এখানেই শেষ নয়। সিএজি-র অডিটে দেখা গেছে, ৬টি রেল জোনের ৫৯টি স্টেশনে পানীয় জলের কোনো প্রকার ব্যাকটেরিয়োলজিক্যাল পরীক্ষাই করা হয়নি!

অর্থাৎ জলের নামে যাত্রীদের কী খাওয়ানো হচ্ছে, তা পরীক্ষা করারও প্রয়োজনবোধ করেনি প্রশাসন। ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে ৮টি জোনের ৪৯টি স্টেশন এবং ২০২৩-২৪ সালে ৯টি জোনের ৫৬টি স্টেশন থেকে সংগৃহীত জলের নমুনায় ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হয়েছে। নিয়মিত পরীক্ষা ও ওয়াটার কুলার পরিশোধনের যে কঠোর প্রশাসনিক নির্দেশিকা রয়েছে, তা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

পানীয় জলের পাশাপাশি রেলস্টেশনের পরিচ্ছন্নতা ও মৌলিক কাঠামোগত পরিষেবাতেও বড় ধরনের দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৮ সালের এপ্রিলে রেলওয়ে বোর্ড প্ল্যাটফর্মের বসার ব্যবস্থা, পানীয় জলের কল, শৌচাগার, ইউরিনাল, পাখা, ফুট ওভারব্রিজ, ডাস্টবিন ও পাবলিক অ্যানাউন্সমেন্ট সিস্টেমের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু অডিটে দেখা গেছে, পরিদর্শিত ৫১২টি স্টেশনের মধ্যে ৪৫৮টি স্টেশনেই অর্থাৎ ৮৯ শতাংশেরও বেশি স্টেশনে এই ন্যূনতম পরিষেবাগুলোর তীব্র ঘাটতি রয়েছে!

এমনকি দেশের এন এস জি-১ ক্যাটাগরিভুক্ত বিশ্বমানের দাবিদার স্টেশন যেমন নয়াদিল্লি, হাওড়া, শিয়ালদহ, মুম্বাই সেন্ট্রাল এবং ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাসও এই চরম ব্যর্থতা থেকে রেহাই পায়নি। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২,০৩৫টি স্টেশনে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে পানীয় জলের কলের সংখ্যা কম, ২০১টি স্টেশনে শৌচাগারের চরম অভাব এবং ৪০৩টি স্টেশনে পর্যাপ্ত ইউরিনালই নেই।

গিজগিজ করা প্ল্যাটফর্মে ডাস্টবিনের অভাব আর চরম নোংরা পরিবেশের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাধারণ মানুষকে কাটাতে হচ্ছে। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ সময়কালে পরিচালিত এই টেস্ট অডিটের পর সিএজি রেল দপ্তরকে অবিলম্বে সতর্ক হতে বলেছে। সমস্ত জোনে নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক জল পরীক্ষা, অভিন্ন ওয়াটার কোয়ালিটি প্রোটোকল মেনে চলা এবং প্ল্যাটফর্মে ন্যূনতম যাত্রী পরিষেবা দ্রুত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার কড়া সুপারিশ করা হয়েছে।

টিকিটের দাম বৃদ্ধি ও আধুনিক ট্রেনের ঢাকঢোল পেটানোর মাঝে প্রতিদিনের কোটি কোটি সাধারণ যাত্রীর তৃষ্ণার জলে এই বিষের উপস্থিতি রেলের পরিচালন ব্যবস্থা ও স্বচ্ছতার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে। এখন দেখার, সিএজি-র এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্টের পর রেল মন্ত্রক কি দোষী আধিকারিকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে জল শোধনে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, নাকি কোটি কোটি যাত্রীকে প্রতিদিন এভাবেই ‘ই-কোলাই’ মিশানো জল খেয়েই যাতায়াত করতে হবে? উত্তরের অপেক্ষায় স্তম্ভিত দেশবাসী।

Related Posts

লালা হাসপাতালে পরিষেবা নয় যেন নার্সের চোখরাঙানি!

যন্ত্রণায় কোঁকাচ্ছে রোগী, আড্ডায় ব্যস্ত নার্স! সরকারি হাসপাতালে এত তাড়া কিসের? নার্সের কুকথায় ক্ষুব্ধ লালাবাসী বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৮ আগষ্টঃ এটা কোনো প্রাইভেট হাসপাতাল নয়, সরকারি হাসপাতাল! এত তাড়াহুড়ো কিসের?…

শিক্ষা উন্নয়নের টাকা লালফিতার ফাঁসে বন্দি! সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার অনুদান খরচই করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রক, সিএজি রিপোর্টে ফাঁস চাঞ্চল্যকর তথ্য

উচ্চশিক্ষার মান যাচাইয়ে ফেল মার্কার, ন্যাকের স্বীকৃতি ছাড়াই চলছে দেশের সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয় বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৮ আগষ্টঃ ভারতের ভবিষ্যৎ গড়ার তাগিদে প্রতি বছর কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে অঢেল অর্থ বরাদ্দের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *